gramerkagoj
শুক্রবার ● ১৪ জুন ২০২৪ ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
gramerkagoj

❒ গ্রামের কাগজে সংবাদ প্রকাশের পর তড়িৎ অ্যাকশন

বেতন বন্ধ হলো নয় বছর স্কুলে না যাওয়া শিক্ষিকা লতিকার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ জুন , ২০২৪, ০৮:৫৭:০০ পিএম
এম. আইউব:
GK_2024-06-11_666867874837e.jpg

অবশেষে বেতন বন্ধ হলো দীর্ঘ নয় বছর স্কুলে না যাওয়া শিক্ষিকা লতিকা রানীর। তিনি যশোর সদর উপজেলার সিএজিএম (চান্দুটিয়া আরিজপুর গোবিন্দপুর মটবাড়ি) হাইস্কুলের শিক্ষিকা। গ্রামের কাগজে সংবাদ প্রকাশের পর তার বেতন বন্ধে তড়িৎ অ্যাকশন নিয়েছেন যশোর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার রবিউল ইসলাম। তিনি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নানকে নয় বছর দায়িত্ব পালন না করে লতিকা রানী কীভাবে সরকারি অর্থ গ্রহণ করছেন সে বিষয়ে জানতে পত্র দেন। যার স্মারক নম্বর উমাশিঅ/সদর/যশোর/২০২৪-২০০। ওইপত্রে সিভিল সার্জন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের স্মারক নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে।
মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ওইপত্রে উল্লেখ করেছেন,‘মহাপরিচালক,মাউশি মহোদয়ের নির্দেশনা মোতাবেক সিভিল সার্জন যশোর মহোদয়ের গঠিত সরকারি মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তের আলোকে তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ায় সরকারি বেতন প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ এমপিও কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে জনাব লতিকা রানীকে চাকরি হতে অব্যাহতি দেয়ার জন্য ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে পত্র দেন।পত্র মোতাবেক ম্যানেজিং কমিটির এ বছরের ২৯ জানুয়ারির সভায় তাকে অব্যাহতি দেয়াসহ মাউশিকে অবহিত করা হয়। এতদ কারণে জনাব লতিকা রানীর বেতন ভাতাদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও দুঃখজনক কারণে তার বেতনভাতাদি চলমান থাকায় সরকারি অর্থ অপচয় হইতেছে। এভাবে বছরের পর বছর সরকারি অর্থ অপচয় বন্ধ করার জন্য আপনার সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের এ সংক্রান্ত পত্র পাওয়ার পর মে মাসের বেতন বিলে অনুপস্থিত শিক্ষক লতিকা রানীর নাম রাখা হয়নি। দীর্ঘ নয় বছর পর সরকারি অর্থ অপচয় বন্ধ হলো বলে মন্তব্য করেছেন ওই স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় লোকজন। তাদের মতে, আরও আগেগ এই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল।
শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে লতিকা রানী ২০১৪ সাল থেকে নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছিলেন না। তখন মানবিক কারণে তাকে ছাড় দেন স্কুলের শিক্ষকসহ তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি। সর্বশেষ, ২০১৫ সাল থেকে তিনি একেবারেই স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন। সেই থেকে এ পর্যন্ত তিনি আর স্কুলে আসেননি। অথচ ১০৫ মাসে তিনি অবৈধভাবে বেতন উত্তোলন করেছেন ২১ লাখ ১২ হাজার ১১৯ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৪ সালে লতিকা রানীর ব্রেনে টিউমার ধরা পড়ে। ২০১৫ সালে তার দু’টি চোখেরই দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। সেই থেকে তিনি কোনো ছুটির আবেদন করেননি। জমা দেননি মেডিকেল সার্টিফিকেটও। বছরের পর বছর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার কারণে প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান তাকে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। কিন্তু একবারও জবাব দেননি তিনি। এরপর লতিকা রানীর বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে প্রধান শিক্ষক বিগত জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খানের কাছে আবেদন করেন। আবেদন পাওয়ার পর জেলা প্রশাসক তৎকালীন জেলা শিক্ষা অফিসার একেএম গোলাম আজমকে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেন। জেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশে তৎকালীন সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার আশিক আহমেদকে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার দায়িত্ব দেন। আশিক আহমেদ লতিকা রানীর বাড়িতে গিয়ে তাকে অন্ধ দেখতে পান। এরপর তিনি অন্ধ এবং স্কুলে গিয়ে পাঠদানে অক্ষম বলে প্রতিবেদন জমা দেন। সর্বশেষ,সিভিল সার্জনের প্রত্যয়ন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট পাওয়ার পর এমপিও কমিটির সুপারিশে মহাপরিচালকের পক্ষে মাধ্যমিক-২ শাখার শিক্ষা কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি পত্র বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বরাবর আসে। ওইপত্রে সিএজিএম স্কুলের হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষক লতিকা রানীকে চাকরি থেকে অব্যাহতির নির্দেশ দেয়া হয়।
এরপর মাউশির ওইপত্র নিয়ে বিগত ম্যানেজিং কমিটির ২৯ জানুয়ারির সভায় দীর্ঘ আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হয়, সরকারি বিধি অনুযায়ী লতিকা রানীকে অব্যাহতি দেয়ার। একইসাথে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তার বেতন বন্ধ করে বিগত কমিটি। দু’ মাস বন্ধ থাকার পর বর্তমান কমিটি বিধি বহির্ভূতভাবে লতিকা রানীর বেতন চালু করে। এ নিয়ে গ্রামের কাগজে অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ হলে নড়েচড়ে বসেছেন শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটি। দীর্ঘদিন পর অপচয় বন্ধ হচ্ছে সরকারি অর্থের।
এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান বলেন,‘শিক্ষা অফিস থেকে পত্র আসার পর লতিকা রানীর বেতন বন্ধ করা হয়েছে। সভাপতি সাহেব বিষয়টি পর্যালোচনার পর তাকে বাদ দেয়া বেতন বিলে স্বাক্ষর করেছেন।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার রবিউল ইসলাম বলেন,‘গ্রামের কাগজের অনুসন্ধানের পর বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত হই। এরপর বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রধান শিক্ষককে পত্র দিয়েছি। যতটুকু জানতে পেরেছি, পত্র পাওয়ার পর মে মাস থেকে লতিকা রানীর বেতনবন্ধ করা হয়েছে।’

আরও খবর

🔝