gramerkagoj
সোমবার ● ২৭ মে ২০২৪ ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
gramerkagoj
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাকে মর্যাদা প্রদান ও প্রাসঙ্গিকতা
প্রকাশ : রবিবার, ২৮ এপ্রিল , ২০২৪, ১০:০৩:০০ পিএম
আলী ইদরীস:
GK_2024-04-28_662e7527e296b.jpg

আজ থেকে ৯৬ বছর আগে ইংরেজি ১৯২৮ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বিদায়’ কবিতায় প্রশ্ন রেখেছিলেন- “কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?” কেউ শুনতে পান বা না পান, বর্তমান সরকার প্রধান ও শিক্ষামন্ত্রী কালের যাত্রার ধ্বনি ঠিকই শুনতে পেয়েছেন এবং অনুধাবনও করেছেন। সে কারণেই সরকার ৪র্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে আমাদের বিপুল জনরাশিকে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তর করার জন্য কারিগরি শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
আমরা সকলে জানি তরুণ ও যুবশক্তির সংখ্যাধিক্যে বাংলাদেশ এখন একটি সুবর্ণ সময় অতিবাহিত করছে। ২০৩০ সাল হতে ২০৩৮ সালের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ সীমায় উপনীত হবে অর্থাৎ ঐ সময়ে মোট সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ হবে তরুণ ও যুব সম্প্রদায়। এই বিশাল যুবশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে তাদের জীবনে নেমে আসবে চরম বেকারত্বের অভিশাপ। দক্ষতাহীন শিক্ষিত মানুষের উচ্চশিক্ষার সনদ কোনই কাজে আসবে না। কারণ ঐ সনদ দ্বারা কোন ভ্যালু ক্রিয়েট হবে না। ভয়াবহ সেই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ জনসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছেন।
দক্ষ জনবল তৈরির বৃহত্তম শিক্ষাঙ্গন হলো দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসমূহ। এখানে ৪ বছর মেয়াদি কোর্স অধ্যয়ন শেষে ডিপ্লোমা-ইন ইঞ্জিনিয়ারিং সনদ প্রদান করা হয়। কারিকুলাম অনুযায়ী ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের শিক্ষার্থীরা ৬০-৬৫ ভাগ ব্যবহারিক ও ৩৫-৪০ ভাগ তাত্ত্বিক বিষয়ে জ্ঞানার্জন করে থাকেন। এসএসসি, এইচএসসি (বিজ্ঞান) ও এইচএসসি (ভোকেশনাল) পাস ছাত্রছাত্রীরা এই কোর্সে ভর্তির সুযোগ পায়। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর তাদের ইয়ার অব স্কুলিং হয় সর্বনিম্ন ১৪ বছর এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছর। ইয়ার অব ¯ু‹লিং অনুযায়ী সনদের স্বীকৃত মর্যাদা বা মান না থাকায় সমাজে তারা হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন এবং এইচএসসি সমমান হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হিসেবে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসমূহে ছাত্র ভর্তির হার ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা ২০১৭-১৮ সেশনে যেখানে শতকরা ৭ থেকে ৭.৫ ভাগ ভর্তি হয়েছিল, ২০২৩ সালে তা হ্রাস পেয়ে শতকরা ৩ ভাগে নেমে এসেছে। সরকারি ও বেসরকারি পলিটেকনিকসমূহে বিপুল সংখ্যক আসন শূন্য থেকে যাচ্ছে। এর ফলে সরকারের ২০৪১ সালের উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যার্জন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া আসন শূন্য থাকায় সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে।
দক্ষতাহীন শিক্ষিত স্নাতকধারী বেকার বেশি
কারিগরি শিক্ষাপ্রাপ্ত দক্ষ ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ অপেক্ষাকৃত বেশি। তাই তাদের মধ্যে বেকারত্বের হারও সবচেয়ে কম। ২০১৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যানুযায়ী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার সাড়ে ৭ শতাংশ, এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে এ হার ১৩.৬ শতাংশ। কিন্তু স্নাতক ও স্নাতক-পরবর্তী পর্যায়ে শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৬.৪ শতাংশ। অর্থাৎ যার শিক্ষার ডিগ্রি যত বেশি, তার বেকার থাকার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি স্নাতকের নিচ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।
২০১৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপেই দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৩ - এই তিন বছরে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করা তরুণ-তরুণীদের বেকারত্বের হার কমেছে। কিন্তু একই সময়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার সাড়ে ৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০ সালে এ হার ছিল ৯.৯ শতাংশ, আর ২০১৩ সালে হয়েছে ১৬.৪ শতাংশ। এ পরিসংখ্যানই বলে দেয়Ñ কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া এখন সময়ের দাবি।
উপরের জরিপ থেকে স্পষ্ট হয় যে, শিক্ষিত যুবসমাজের বেকারত্বের হার কমাতে হলে কিংবা তা যেন আর বাড়তে না পারে সে ব্যবস্থা করতে হলে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে কারিগরি শিক্ষার প্রতি তাদের আরও বেশি আকৃষ্ট করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিসিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৪ লাখ ৩০ হাজার। এসব বেকারের মধ্যে শিক্ষিত তরুণ বেশি।
ত্রৈমাসিক ‘শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩’ (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। বিবিএস বলছে, বেকারদের মধ্যে ১৬ লাখ পুরুষ এবং নারী ৮ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে অনেকেরই চাকরি পাওয়ার বয়স পার হয়ে গেছে। [সূত্র ঃ কালের কণ্ঠ, ৮ নভেম্বর ২০২৩]
বিবিএস-এর তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের মোট বেকারের ১২ শতাংশই উচ্চ শিক্ষিত। যাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের বেকারত্বের হার মাত্র ১.০৭ শতাংশ। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা বেকারের হার ৮.৭৮ শতাংশ এবং মাধ্যমিক উত্তীর্ণ বেকার ২.৪২ শতাংশ। প্রাথমিকের গন্ডি পার হওয়া বেকারের হার ১.৬৯ শতাংশ এবং অন্যান্য মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ করা ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার ৪.৮৭ শতাংশ।
আরো বাড়বে বেকারত্ব
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর গবেষণায় জানানো হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা ৬৬ শতাংশই বেকার থাকছেন। আবার, লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের হিসেবে, বাংলাদেশে ১০০ জন স্নাতকের মধ্যে ৪৭ জনই বেকার।
আইএলও’র ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি। আগামী কয়েক বছরে তা ৬ কোটিতে দাঁড়াবে। এটা মোট জনসংখ্যার ৩৯.৪০ শতাংশ হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
বাড়ছে হতাশা
উচ্চশিক্ষিত হয়েও চাকরি না পেয়ে দেশের যুবসমাজের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের একটি সমীক্ষাতে বলা হয়, বাংলাদেশে যুবগোষ্ঠির বড় অংশ আর্থ-সামাজিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বৈষম্য আর গুণগত শিক্ষার অভাবে ৭৮ শতাংশ তরুণ মনে করেন, পড়াশোনা করে তারা চাকরি পাবেন না। গরিব পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে এই হার ৯০ শতাংশ। চাকরি, পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ নেই ২৯.৮ শতাংশ তরুণের।
উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২য়
উচ্চশিক্ষা এখন আর কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। তরুণরা যত বেশি লেখাপড়া করছেন, তাদের তত বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (্আইএলও)-এর আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে তৈরি এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হারে পাকিস্তান ১ম (১৬.৮ শতাংশ)। বাংলাদেশে এ হার ১০.৭, যা এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে ২য় সর্বোচ্চ। বেকারত্বের হারে ভারত এ অঞ্চলে তৃতীয় (৮.৪ শতাংশ)।
‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়। এতে ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের ২৮টি দেশের বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান, নিষ্ক্রিয় তরুণের হার, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, কর্মসন্তুষ্টি ইত্যাদির তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে। [সূত্র ঃ দৈনিক যুগান্তর, ২৭ এপ্রিল ২০২৪; ইকবাল হোসেন, ২০ জানুয়ারি ২০১৯]
প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের অভিমত
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, “লেখাপড়া শুধু পরীক্ষা আর ডিগ্রিকেন্দ্রিক হলে হবে না। লেখাপড়া হতে হবে জ্ঞানকেন্দ্রিক। আমাদের স্টুডেন্টদের দক্ষতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি।” [সূত্র ঃ এই সময়, ৪ মার্চ ২০২৪]

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন তারুণ্যের সংখ্যা বেশি। তাই তারা বেশি বেকার হবেÑ এটাই স্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশের যে শিক্ষা পদ্ধতি রয়েছে তার সাথে চাকরির বাজারের কোনো মিল নেই। তাই তরুণরা বেশি বেকার হচ্ছে। [সূত্র ঃ কালের কণ্ঠ, ৮ নভেম্বর ২০২৩]
সরকারি কমিটি গঠন
সরকার গত ১৫ এপ্রিল ২০২৪ ডিপ্লোমা-ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাগত যোগ্যতাকে বিএসসি (পাস)-এর (বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং নয়) সমমান/সমতুল্য মর্যাদা দেবার লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছেন। সরকারের এই দূরদর্শি উদ্যোগ দক্ষ জনসম্পদ তৈরিতে যুগান্তকারি ভূমিকা রাখবে।
এই কমিটি গঠিত হবার পরপরই অনেকেই ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সরকারের এই মহতী উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন। সরকার ইয়ার অব স্কুলিং ও দক্ষতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাগত যোগ্যতাকে সাধারণ শিক্ষার বিএসসি ডিগ্রি সমমানের মর্যাদা দিতে চান। বিএসসি-ইন ইঞ্জিনিয়ারিং বা ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সমমান নয়। বিষয়টি সরকারি প্রজ্ঞাপনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। তারপরও একশ্রেণির গোষ্ঠি স্বার্থান্ধ পেশাজীবী সদস্য ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা অজ্ঞানতাবশত বিরোধিতায় সোচ্চার হয়েছেন। কড়া বিবৃতি দিচ্ছেন, প্রতিবাদও জানাচ্ছেন।
সরকার কর্তৃক অনুমোদিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেম (বিএনকিউএফ)-এ ডিগ্রি প্রকৌশলীদের লেভেল ৭ এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের লেভেল ৬-এ অবস্থান সুনিশ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় প্রয়োজনে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাগত যোগ্যতাকে সাধারণ শিক্ষার ডিগ্রি সমমানের মর্যাদা দেয়া হলে বিরোধিতাকারীদের অসুবিধা কোথায় তা বোধগম্য নয়। বরং ডিগ্রি (পাস) সমমানের মর্যাদা দেয়া হলে দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসমূহে ছাত্রছাত্রী ভর্তির হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে, সৃষ্টি হবে দক্ষ জনসম্পদ Ñ বাস্তবায়িত হবে ২০৪১ সালে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন। দেশপ্রেমিক সকল নাগরিকের তো এটাই চাওয়া উচিত।
সাধারণ শিক্ষার বিএসসি-এর সমমান/সমতুল্য মর্যাদা দেবার কয়েকটি অনুকূল তথ্য ঃ
ইয়ার অব স্কুলিং
বাংলাদেশে ডিপ্লোমা-ইন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামটি এসএসসি পাস শিক্ষার্থীদের জন্য ৪ বছর অর্থাৎ ৮ সেমিস্টার, এইচএসসি (বিজ্ঞান) বিভাগে পাস শিক্ষার্থীদর জন্য ৩ বছর বা ৬ সেমিস্টার এবং এইচএসসি (ভোকেশনাল) পাস শিক্ষার্থীদের জন্য ২ বছর ৬ মাস বা ৫ সেমিস্টারের একটি একাডেমিক প্রোগ্রাম। এই প্রোগ্রামের ন্যূনতম ইয়ার অব স্কুলিং এসএসসি পাস শিক্ষার্থীদের জন্য ১৪ বছর, এইচএসসি (ভোকেশনাল) শিক্ষার্থীদের জন্য ১৪ বছর ৬ মাস এবং এইচএসসি (বিজ্ঞান) পাস শিক্ষার্থীদের জন্য ১৫ বছর।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার মেয়াদ ও ইয়ার অব স্কুলিং
পৃথিবীর উন্নত এবং উন্নয়নশীল প্রায় সকল দেশে ডিপ্লোমা-ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা কোর্সে ভিন্নতা থাকলেও ইয়ার অব স্কুলিং সর্বনিম্ন ১৪ বছর এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছর। চীনে ১২ বছরের বেসিক এডুকেশনের পর ৩ বছর অর্থাৎ মোট ইয়ার অব স্কুলিং ১৪, জাপানে ৯ বছরের বেসিক এডুকেশনের পর ৫ বছর অর্থাৎ মোট ইয়ার অব স্কুলিং ১৪, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে ১১ বছরের বেসিক এডুকেশন (জিইসি ও লেভেল/জিইসি নরমাল ও লেভেল)-এর পর ৩ বছর অর্থাৎ মোট ইয়ার অব স্কুলিং ১৪। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডাসহ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সকল দেশে ১২ বছরের বেসিক এডুকেশনের পর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে বা কমিউনিটি কলেজসমূহে কমপক্ষে ২ বছর। অর্থাৎ সকল ক্ষেত্রেই মোট ইয়ার অব স্কুলিং কমপক্ষে ১৪ বছর।
ক্রেডিট আওয়ার
বিএসসি ডিগ্রির জন্য মোট অর্জিত ক্রেডিট বিবেচনায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাটি সকল বিধান ও শর্তসমূহ পূরণ করে। বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেনশন কাউন্সিল (বিএসি)/ইউজিসি’র সর্বশেষ বিধান অনুযায়ী ডিগ্রির জন্য বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থীকে এইচএসসি’র পর ন্যূনতম ১১০ ক্রেডিট অর্জন করতে হয়। যেখানে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ক্ষেত্রে এইচএসসি (বিজ্ঞান) বিভাগে পাস একজন শিক্ষার্থীকে ১১২ থেকে ১২০ ক্রেডিট অর্জন করতে হয়। আবার এসএসসি পাস একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং অর্জনের জন্য সর্বমোট ক্রেডিট অর্জন করতে হয় ন্যূনতম ১৫০ এবং সর্বোচ্চ ১৬০ ক্রেডিট।
কনটাক্ট ও কন্ট্রাক্ট আওয়ার
কনটাক্ট ও কন্ট্রাক্ট আওয়ার বিবেচনায় ৪ বছরের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের একজন শিক্ষার্থী একজন ডিগ্রি (পাস) কোর্সের শিক্ষার্থীর চেয়ে অধিকতর সময় শিক্ষকগণের কনট্রাক্টে থাকে এবং ৪৫ থেকে ৫০টি বিষয়ে অধ্যয়ন করে।

বিশেষায়িত শিক্ষা
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং একটি বিশেষায়িত শিক্ষা। দক্ষতা অর্জনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই শিক্ষাগত যোগ্যতাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া উচিত।
কেননা ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয় ছাড়াও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের শিক্ষার্থীদের ইন্টারমিডিয়েট এবং বিএসসি/অনার্স লেভেলের উচ্চতর গণিত ও অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিক্সসহ অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রি পড়ানো হয়- যা ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের ডিজাইন ও ক্যালকুলেশনে প্রয়োগ হয়। এছাড়া সোস্যাল সায়েন্স, ম্যানেজমেন্ট, এন্টারপ্রিনিয়রশিপ, একাউন্টিং, এনভায়রনমেন্টাল, বাংলা, ইংরেজি ইত্যাদি বিষয় বিভিন্ন পর্বে পড়ানো হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞানমনস্ক সামাজিক ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।
উপরোক্ত ইতিবাচক বিষয়াদি ও উপযুক্ত পরিবেশ বিরাজমান থাকা সত্ত্বেও এদেশে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সামাজিক মর্যাদায় অন্যান্য যে কোন ডিগ্রিধারীদের চেয়ে কম গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ন্যূনতম ১৪ এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছরের স্কুলিং অর্জন করলেও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাকে অনেকেই উচ্চমাধ্যমিক-এর সমতুল্য গণ্য করে থাকেন। উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হতে হলে একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারকে এইচএসসি’র সমতুল্য বিবেচনা করে ভর্তি করা হয়।
উপসংহার
প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২৩ এপ্রিল ২০১৪ একটি অনুষ্ঠানে বলেছেনÑ “ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা দেশ ও জনগণের জন্য শতকরা ৮৫ ভাগ কাজ করে থাকেন।” প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি যথার্থই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে বর্তমানে কলকারখানা, অফিস আদালত, শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বীমাসহ এমন কোন স্থান বা প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে দক্ষ ও মধ্যমস্তরের প্রযুক্তিবিদ তথা ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের প্রয়োজন হয় না। সকল ক্ষেত্রে মধ্যমস্তরের প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদের চাহিদা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।
তারপরও সরকারের কারিগরি শিক্ষাকে জনপ্রিয়করণের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে শুধুমাত্র সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কারণে। এই সামাজিক বন্ধ্যাত্ব থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাকে মানুষের কাছে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করা এখন সময়ে দাবী।
# লেখকঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি ও কথাসাহিত্যিক

 

 

আরও খবর

🔝