যশোরের কেশবপুরে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণ শুক্রবারজুড়ে অব্যাহত থাকে। এরপরও কয়েক দিন ধরে থেমে থেমে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। অবিরাম বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন সড়ক, বাজার ও নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, গৃহিণী ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
বৃষ্টির কারণে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অধিকাংশ মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারেননি। ফলে বাজার, হাট ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ক্রেতা কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে শ্রমনির্ভর কাজ বন্ধ থাকায় দিনমজুরদের অনেকেই আয়-রোজগার হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
পাঁজিয়া এলাকার দিনমজুর ইসলাম উদ্দিন বলেন, “তিন-চার দিন ধরে তেমন কোনো কাজ নেই। সকাল থেকে বের হলেও কাজ মেলে না। আয় না থাকলে সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে যায়। ধার-দেনা করে চলতে হচ্ছে।”
কেশবপুর পৌর বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. হাফিজুর ইসলাম বলেন, “বৃষ্টির কারণে বাজারে ক্রেতা অনেক কম। অনেক সবজি বিক্রি না হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে।”
উপজেলার বেলকাটি গ্রামের কৃষক আতিয়ার রহমান জানান, নিচু জমিতে পানি জমে থাকায় সবজি ও আমনের বীজতলা ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে আমন চাষের জন্য এ বৃষ্টি উপকারী বলে তিনি মনে করেন। দ্রুত পানি নেমে গেলে বড় ধরনের ক্ষতি হবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন।
টানা বর্ষণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুররা। নির্মাণকাজ, মাটি কাটা ও কৃষিকাজ বন্ধ থাকায় অনেকেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজের অপেক্ষায় থেকেও খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন। এতে পরিবারের খাদ্য, সন্তানদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ধার-দেনা করছেন।
বালিয়াডাঙ্গা এলাকার দিনমজুর হারুন গাজী বলেন, “বৃষ্টি হলে আমাদের কপালই বন্ধ হয়ে যায়। কাজ না করলে আয় নেই, আয় না হলে বাজারও করা যায় না। ঘরে চাল-ডাল শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন ধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে।”
আরেক দিনমজুর মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “প্রতিদিন সকালে কাজের সন্ধানে বের হই। কিন্তু বৃষ্টির কারণে ঠিকাদাররা কাজ বন্ধ রেখেছেন। দুই-তিন দিন ধরে কোনো আয় নেই। ছোট সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতেই কষ্ট হচ্ছে।”
জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া মানুষও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক যাত্রীর অভিযোগ, টানা বৃষ্টির সুযোগে কিছু ভ্যানচালক স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন।
কেশবপুর মাছ বাজার এলাকার বাসিন্দা তুহিন গাজী বলেন, “জরুরি কাজে বের হতে হয়েছিল। কিন্তু রাস্তায় ভ্যান কম থাকায় স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিতে হয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা সৌরভ বলেন, “যে পথে সাধারণ সময়ে ১০-১৫ টাকা ভাড়া লাগে, সেখানে এখন ২০-৩০ টাকা দিতে হয়েছে। উপায় না থাকায় বেশি ভাড়া দিয়েই যেতে হয়েছে।”
তবে কয়েকজন ভ্যানচালক জানান, বৃষ্টির কারণে যাত্রী কমে গেছে এবং পানি জমে থাকায় চলাচলে সময় ও পরিশ্রম বেশি লাগছে। তাই কিছুটা বেশি ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
টানা বৃষ্টিতে গৃহিণীদের দুর্ভোগও বেড়েছে। অনেক বাড়ির উঠান ও রান্নাঘরের আশপাশে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক গৃহস্থালির কাজ ব্যাহত হচ্ছে। কাপড় শুকাতে না পারা, জ্বালানি ভিজে যাওয়া, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং ছোট শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অনেকেই। দীর্ঘ সময় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ থাকায় জ্বর, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন রোগের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
পৌরসভার মধ্যকুল গ্রামের রহিমা বেগম ও পাথরঘাটা গ্রামের আসমা বেগম বলেন, “সারাদিন বৃষ্টি থাকায় কাপড় শুকানো যাচ্ছে না। ঘরের চারপাশে পানি জমে থাকায় ছোট বাচ্চাদের বাইরে যেতে দিতে পারছি না। রান্নাবান্নাসহ সব কাজেই সমস্যা হচ্ছে।”
উপজয়ের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার কারণে অনেক বাড়ির উঠান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়ায় আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। পানি জমে থাকায় সাপ ও অন্যান্য বিষাক্ত প্রাণীর উপদ্রবের আশঙ্কাও বেড়েছে।
আলতাপোল তালতলা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “একটানা বৃষ্টিতে বাড়ির উঠান পানির নিচে চলে গেছে। ঘর থেকে বের হতে হলে পানি মাড়িয়ে যেতে হচ্ছে। দ্রুত পানি না নামলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে।”
টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে না। মাঠ ও প্রবেশপথে কাদা-পানি জমে থাকায় বিদ্যালয়ে যাতায়াতেও সমস্যা হচ্ছে। একই সঙ্গে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরাও সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নিচু সড়কে পানি জমে থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। তারা দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার এবং দুর্যোগকালীন সময়ে যানবাহনের ভাড়া নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বৃষ্টিপাত আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকলে নিম্নাঞ্চলের জলাবদ্ধতা বাড়বে এবং কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।