
যশোর ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিতমুখ, আন্তর্জাতিক ফুটবল রেফারি, যশোরের প্রথম দিকের খেলার সামগ্রীর দোকান খেলাঘরের স্বত্বাধিকারী ছিলেন আনসারুল ইসলাম মিন্টু আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শনিবার ভোরে ঘোপ নওয়াপাড়া সকড়ের নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তিনি স্ত্রী ও দুই ছেলে, নাতি, নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বাদ জোহর নওয়াপাড়া রোড জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে নামাজে জানাজা শেষে ঘোপ কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে তার মৃত্যুর সংবাদ শুনে কাজী আনসারুল ইসলাম মিন্টুর বাড়িতে ছুটে যান যশোরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি তার বাড়িতে ছুটে যান এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। বাংলাদেশ ফুটবল রেফারিজ এসোসিয়েশন ঢাকা ও যশোর জেলা শাখা তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
আনসারুল ইসলাম মিন্টুর রেফারি জীবনে অনেক চ্যালেঞ্জময় ম্যাচের গল্প ছিল। আশির দশকে ফুটবলের বাঁধভাঙ্গা জনপ্রিয়তার কালে মোহামেডান-আবাহনীর হাইভোল্টেজ ম্যাচ সবচেয়ে বেশি পরিচালনা করেছেন তিনিই। ৭৫ সালে রেফারি জীবন শুরু করা ফিফা স্বীকৃত এই রেফারি ৯৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ণাঢ্য রেফারি জীবনের সমাপ্তি টানেন। ৮৭ সালে আর্মি স্টেডিয়ামে দর্শকবিহীন আবাহনী ও মোহামেডানের মধ্যে যে ম্যাচটি হয় সেটিও তিনি পরিচালনা করেন। আবার ৮৬ সালে আরও একটি উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের অনন্য সাক্ষী ছিলেন আনসারুল ইসলাম মিন্টু। মোহামেডান ও আবাহনীর মধ্যেকার উত্তেজনাপূর্ণ এই ম্যাচের ঢাকা স্টেডিয়ামে দর্শকে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। এই ম্যাচ পরিচালনার পর ফুটবল ফেডারেশন কর্তৃক সেরা রেফারি নির্বাচিত হন আনসারুল ইসলাম মিন্টু। ঐ বছরই তিনি বাংলাদেশ ত্রীড়া লেখক সমিতির পুরস্কার পান।
শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও তিনি অনেক ম্যাচ পরিচালনা করেন। পাকিস্তান, ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে ফিফার আমন্ত্রিত রেফারি হিসেবে ম্যাচ পরিচালনা করেছেন তিনি। ৮৩ সালে কাজী আনসারুল ইসলাম মিন্টু আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পান। সে বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপে মোট চারটি ম্যাচ পরিচালনা করেন তিনি। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করেন কলকাতা মোহামেডান এবং চায়নার একটি ক্লাবের মধ্যেকার খেলা। ৮৫ সালে তিনি পাকিস্তানে যান কায়েদা আজম ট্রফি ম্যাচ পরিচালনার জন্যে। এ টুর্নামেন্টে মোট ৩টি ম্যাচ পরিচালনা করেন। ক্যারিয়ারে ১০টির মতো আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করেছেন আনসারুল ইসলাম মিন্টু। ৮৭ তে ভারতে অনুষ্ঠিত সার্ক ফুটবলে ৩টি ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন। ফাইনাল ম্যাচেও রেফারি ছিলেন তিনি। ফাইনালে ভারত ১-০ গোলে নেপালকে পরাজিত করে। কাজী আনসারুল ইসলাম মিন্টু পেশাদার রেফারি হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে যশোর মাঠের ফুটবলার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতার আগে থেকেই যশোর লীগে নিয়মিতভাবে যশোর কালেক্টরেট ও যশোর টাউন ক্লাবের পক্ষে খেলতে শুরু করেন। ফুটবল খেলতে খেলতে একসময় সিদ্ধান্ত নেন রেফারি হিসেব আত্মপ্রকাশ করবেন।
৭৫ সালের কোনো এক সময়ে ঢাকাতে বাংলাদেশ রেফারিজ এসোসিয়েশন নতুন রেফারি তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। আতাউল হক মল্লিকের অনুপ্রেরণায় রেফারি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেন আনসারুল ইসলাম মিন্টু। প্রশিক্ষণে তিনি উত্তীর্ণ হয়ে তৃতীয় গ্রেডের রেফারি হিসেবে স্বীকৃত হন। প্রশিক্ষণ শেষে যশোরে এসে নিয়মিতভাবে স্থানীয় পর্যায়ের ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করতে থাকেন। এরপর ৭৬ সালে তিনি দ্বিতীয় গ্রেডের রেফারি হিসেবে স্বীকৃত হন। এর মাত্র একবছর পরেই ৭৮ সালে প্রথম শ্রেণির রেফারিতে উত্তীর্ণ হন। বলা যায় এরপরই তার রেফারি জীবনের ভাগ্য দরজা খুলে যায়। ঐ বছরই তার ডাক পড়ে ঢাকা ফুটবল লীগে খেলা পরিচালনার জন্যে।
মন্তব্য করুন