
আজ ভয়াল ২৫ মে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহ এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিন হিসেবে চিহ্নিত ২০০৯ সালের এই দিনে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ঘূর্ণিঝড় আইলা লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের সাতক্ষীরার শ্যামনগর অঞ্চল ও আশপাশের এলাকা।
সেই দুর্যোগে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সুন্দরবনঘেঁষা দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা। প্রাণ হারান নারী ও শিশুসহ অন্তত ৩৯ জন মানুষ। শুধু শ্যামনগর উপজেলাতেই গৃহহীন হয়ে পড়ে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ। জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মাছের ঘের, মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়ে হাজারো পরিবার।
১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও শ্যামনগর ও গাবুরার মানুষ এখনও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। অনেক পরিবার এখনো বেড়িবাঁধের পাশে সরকারি জমিতে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছে। নিরাপদ খাবার পানি, স্থায়ী আবাসন ও কর্মসংস্থানের অভাবে বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি দিয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, মাঝেমধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও নতুন নতুন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তারা আবারও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
গাবুরা ইউনিয়নের পল্লী চিকিৎসক আশরাফুল আলম জানান, আইলার রাতে বেড়িবাঁধ ভেঙে পুরো এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। তার ওষুধের ঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়। একই ঘটনায় প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেকে স্বজন হারান।
স্থানীয় বাসিন্দা কামাল শেখ জানান, জলোচ্ছ্বাসে তার ছাগল ভেসে মারা যায়। একই এলাকার একাধিক শিশু বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়—যা পুরো অঞ্চলে গভীর শোকের ছায়া ফেলে।
গাঙড়ামারী গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কাঞ্চন বিবি আইলার পর থেকে নিঃস্ব জীবনযাপন করছেন। কৃষি ও গবাদিপশু হারিয়ে তিনি এখন জীবিকা নির্বাহ করছেন ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে। তার একমাত্র ছেলেও কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।
আইলার পর থেকে শুধু ঘরবাড়ি নয়, পুরো জীবনযাত্রাই বদলে গেছে উপকূলের মানুষের। নিরাপদ পানির উৎস পুকুরগুলো আর ব্যবহারযোগ্য নেই। কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক পরিবার দারিদ্র্যের চরম সীমায় পৌঁছেছে।
প্রতিবছর মে মাস এলেই উপকূলজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়। দুর্বল বেড়িবাঁধ ও জলবায়ু ঝুঁকির কারণে মানুষ সর্বদা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
এর মধ্যে পরবর্তীতে ঘূর্ণিঝড় ঘূর্ণিঝড় আম্ফান এবং ঘূর্ণিঝড় রেমাল আবারও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দেয়।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি.এম মাসুদুল আলম জানান, আইলার ক্ষত এখনও পুরোপুরি কাটেনি। প্রায় ৮০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার অনেক অংশ এখনো পুরোপুরি পুনর্গঠন হয়নি। প্রায় এক হাজার পরিবার তখন গৃহহীন হয়ে পড়ে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জামান কনক জানান, গাবুরাকে মডেল ইউনিয়ন হিসেবে উন্নয়ন পরিকল্পনায় নেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে প্রায় ১ হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। পাশাপাশি বাঁধের পাশে সবুজ বেষ্টনী তৈরির কাজও চলছে।
ঘূর্ণিঝড় আইলা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষের জীবনে স্থায়ী এক দাগ রেখে গেছে। ১৭ বছর পরেও উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি চলমান থাকলেও বাস্তবতা বলছে—উপকূল এখনও পুরোপুরি নিরাপদ হয়ে ওঠেনি।
মন্তব্য করুন