
সকালের আলো ফুটতেই বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে প্রাইভেট পড়তে এবং বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে ছুটে চলে শিশুরা। কেউ হেঁটে, কেউ সাইকেলে, কেউবা ভ্যানে। কিন্তু তাদের প্রতিদিনের এই যাত্রাপথে রয়েছে এক ভয়ংকর বাস্তবতা। বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হলে পার হতে হয় রেলিংবিহীন, ফাটলধরা এবং জরাজীর্ণ একটি বৃজ। সামান্য অসাবধানতা কিংবা ভারসাম্য হারালেই ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া গ্রামের মৃধাপাড়ার খালের উপর নির্মিত পুরোনো বৃজটি এখন স্থানীয় মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম, এক জীবন্ত মৃত্যুফাঁদ। প্রায় তিন দশক আগে নির্মিত বৃীজটি বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। দুই পাশের রেলিং ভেঙে গেছে বহু আগেই। বৃজের মাঝামাঝি অংশ কয়েক স্থানে ধসে পড়েছে। কোথাও কোথাও স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে ঢালাই দিয়ে সাময়িকভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। দক্ষিণ পাশের কোণায় দেখা দিয়েছে ফাটল। প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ বৃজের উপর দিয়েই ঝুকি নিয়ে চলাচল করছেন অন্তত ১৫ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ১৩৫ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ছয় ফুট প্রশ^স্ত বৃজটির দুই পাশে কোনো নিরাপত্তা (রেলিং) ব্যবস্থা নেই। নিচে রয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীর খাল, যা বর্তমানে কচুরিপানায় পরিপূর্ণ। বৃজের উপর দিয়ে হাঁটার সময় সামান্য পা হড়কালেই নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে জানান স্থানীয়রা।
বৃজটি এতটাই সরু যে একসঙ্গে দুটি ভ্যান, অটোরিকশা বা অন্যান্য যানবাহন পারাপার করতে পারে না। একদিকের যানবাহন পার না হওয়া পর্যন্ত অপর দিকের যানবাহনকে অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় পথচারীদের জন্যও চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বালিদিয়া, জোকা, রামপুর, ফুলবাড়ি, নিখড়হাটা, শ্রীপুর, কলমধারী, চরবড়রিয়া, গোবরনাদা, মৌশা, ঘোষপুর, কানুটিয়া, গোপীনাথপুরসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম এই বৃজ। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ এই পথ ব্যবহার করে বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন।
বৃজের আশপাশে রয়েছে বালিদিয়া বাজার, শিকদারের মোড় বাজার, বালিদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালিদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি আছাদুজ্জামান কলেজ এবং একাধিক মাদ্রাসা। বিশেষ করে বৃজের উত্তর পাশেই একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবস্থিত হওয়ায় ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।
অভিভাবকদের অনেকেই জানান, প্রতিদিন সন্তান বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় তাদের মধ্যে এক ধরনের অজানা ভয় কাজ করে। রেলিংবিহীন বৃজ পার হওয়ার সময় শিশুরা প্রায়ই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অনেক সময় শিক্ষার্থীদের হাত ধরে পার করে দিতে হয়।
বালিদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহাফুজুর রহমান বলেন, “বৃজটি বহু বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। রেলিং না থাকায় এটি এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দ্রুত একটি নতুন বৃজ নির্মাণ করা জরুরি।”
স্থানীয় শিক্ষক গোলাম মোর্তজা জানান, ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে বৃজটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এরপর আর উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি। ২০১৫ সালের দিকে বৃজের রেলিং সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে দীর্ঘ এক যুগ ধরে এলাকাবাসী চরম ঝুঁকি নিয়ে এটি ব্যবহার করছেন।
মৃধাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আলম মৃধা বলেন, “বৃজের অবস্থা এতটাই খারাপ যে মানুষ প্রতিদিন ভয় নিয়ে চলাচল করে। রেলিং না থাকায় অনেকে নিচে পড়ে আহত হয়েছেন। বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আগেই নতুন বৃজ নির্মাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সমস্যাটি দৃশ্যমান থাকলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তাদের আশঙ্কা, যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই কাগজপত্রের দীর্ঘসূত্রতা শেষ করে দ্রুত নতুন ও প্রশ^স্ত বৃজ নির্মাণকাজ শুরু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের এখন একটাই প্রত্যাশা, আর কোনো দুর্ঘটনার খবর নয়, দ্রুত যেন দৃশ্যমান হয় নতুন একটি নিরাপদ বৃজ। কারণ একটি বৃজ শুধু দুই পাড়কে সংযুক্ত করে না, এটি একটি জনপদের শিক্ষা, অর্থনীতি ও নিরাপদ জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে।
এ বিষয়ে মহম্মদপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. গোলজার হোসেন বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ বৃজটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমরা অবগত। সেখানে একটি নতুন ও প্রশ^স্ত বৃজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় নকশা ও তথ্য-উপাত্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
মন্তব্য করুন