
মাঠ থেকে কেটে রাখা ধানের আঁটি বোঝাই করে টগবগিয়ে ছুটে চলছে ঘোড়ার গাড়িগুলো। ধানের সোঁদা গন্ধ আর চাকার ছন্দময় শব্দে গ্রামীণ মেঠো পথ যেন এক জীবন্ত চিত্রে রূপ নিয়েছে। ঘোড়ার গাড়িতে করে স্বপ্ন নিয়ে ঘরের ফেরার এই দৃশ্যপট সত্যিই অনন্য ও অনবদ্য। এই অপরূপ দৃশ্য যেমন নয়ন জুড়ায়, তেমনই মনে করিয়ে দেয় কৃষকের আজন্ম লড়াইয়ের গল্প।
সবুজ মাঠের বুক চিরে যে সোনালী স্বপ্ন জন্মেছে, তা এখন কৃষকের উঠোনে ওঠার অপেক্ষায়। প্রকৃতির রুদ্ররুপ আর বাজারের নির্মম সমীকরণ পেরিয়ে মাগুরার মহম্মদপুরের মেহনতি কৃষকরে এই কষ্টার্জিত ফসল আনন্দের বারতা নিয়ে আসুক; এটাই এখন গ্রামীণ জনপদের মানুষের একমাত্র প্রার্থনা।
মহম্মদপুর উপজেলার দিগন্তবিস্তৃত মাঠজুড়ে এখন সোনালী স্বপ্নের হাতছানি। জ্যৈষ্ঠের তীব্র তাপদাহ, মেঘের তর্জন-গর্জন আর আকস্মিক ঝড়-বাদলকে উপেক্ষা করে বুকভরা আশা নিয়ে মাঠের সোনার ফসল ঘরে তুলতে দিনরাত ঘাম ঝরাচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ। সোনালী ধানকে ঘিরে গ্রামীণ জনপদে উৎসবের আমেজ থাকার কথা থাকলেও, প্রকৃতির বৈরিতা ও বাজারের অনিশ্চয়তায় কৃষকের চোখে এখন আনন্দ বনাম আশঙ্কার দোলাচল।
উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন কোনো নিপুণ শিল্পী সবুজ ক্যানভাসে ঢেলে দিয়েছেন কাঁচা সোনার রঙ। মহম্মদপুরের বিভিন্ন গ্রামের মাঠ এখন বোরো ধানের সোনালী আভায় মোড়ানো। বাতাসে দুলছে কৃষকের রক্ত জল করা পরিশ্রমের সোনালী স্বপ্ন। মাঠে মাঠে লেগে গেছে ধান কাটার মহা-ধুমধাম। তবে এই উৎসবের আবহেও গ্রামীণ জনপদের আকাশে মেঘের মতো জমছে এক গভীর দুশ্চিন্তা। একদিকে প্রকৃতির বিরুপ চোখ রাঙানি, অন্যদিকে শ্রমিকের চড়া মূল্য এবং বাজারে ধানের দাম কম; সব মিলিয়ে এক মিশ্র অনুভূতির দোলাচলে দুলছেন এই জনপদের অন্নদাতারা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মহম্মদপুর উপজেলায় প্রায় ৫৪ হাজার বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চাষিরা বুকভরা আশা নিয়ে যথাসময়ে বীজতলা তৈরি, জমি কর্ষণ ও চারা রোপণ সম্পন্ন করেছিলেন। ফলে মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফলেছে যেন খাঁটি সোনা। তবে এই অনন্য অর্জনের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না।
মাঠপর্যায়ের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ধানের যখন ভরা যৌবন; ঠিক তখনই প্রকৃতি মেতে উঠেছিল রুদ্ররুপে। প্রচন্ড খরা আর তীব্র তাপদাহে ফেটে চৌচির হয়েছিল ফসলের মাঠ। সেই চরম মুহূর্তে সেচ কাজের জন্য ডিজেল সংকটে দেখা দিয়েছিল তীব্র হাহাকার। তবে শেষমেশ প্রকৃতি কিছুটা সহায় হওয়ায় এবং কাক্সিক্ষত বৃষ্টির দেখা মেলায় পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় কৃষকরা দ্বিগুণ উৎসাহে মাঠের পরিচর্যা শুরু করেন। ফলে সমস্ত প্রতিকূলতা ছাপিয়ে এবার বোরো ধানের ফলন হয়েছে ঈর্ষণীয়।
কিন্তু সোনালী স্বপ্ন যখন ঘরে তোলার উৎসব-মাহেন্দ্রক্ষণ, ঠিক তখনই কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ। আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর ঘন ঘন ঝড়-বাদল কৃষকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এর সাথে নতুন আপদ হিসেবে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট ও চড়া মজুরি। বিঘপ্রতি ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচ আকাশচুম্বী হওয়ায় কৃষকরা হিসাব মেলাতে পারছেন না। বর্তমান বাজারে ধানের যে দাম, তাতে উৎপাদন খরচ উঠবে কি না; তা নিয়ে সংশয় কাটছে না কারোরই।
উপজেলার নাওভাঙ্গা গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ মোল্যা বলেন, ‘এবার ধান চমৎকার হয়েছে, কাটাও শুরু করেছি। কিন্তু আকাশের যে অবস্থা, ঠিকমতো ধানটুকু ভালোভাবে ঘরে তুলতে পারলেই বাঁচি। মেঘ দেখলেই বুকটার ভেতরে দুরু দুরু করে।’
একই রকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ল কাওড়া গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমানের কণ্ঠে। তিনি বলেন, “কিছু ধান কেটে মাঠে বিচালির জন্য রেখেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টির কবলে পড়ে বেশ ক্ষতি হয়ে গেছে। এখনো অনেক ধান কাটা বাকি। মেঘ-বৃষ্টির ভয়ে এখন নতুন করে ধান কাটতে সাহস পাচ্ছি না।”
মহম্মদপুর উপজেলা কৃষি অফিসার পীযুষ রায় এই পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, “এবার বোরো ধানের ফলন আশাব্যঞ্জক। তবে সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরি আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। আমরা মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছি এবং সরকারি আবহাওয়া বার্তা পর্যবেক্ষণ করে কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।”
মন্তব্য করুন