
‘এই মুহূর্তে সেচ ব্যবস্থা সচল রাখা কৃষকদের জন্য খুবই জরুরি’ -কৃষি অফিসার পিযুষ রায়
‘পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা চলছে’ -ইউএনও মুহ: শাহনুর জামান
খুচরা বাজারে কোথাও ডিজেল নেই। পাম্প থেকে টবে ও বোতলে ডিজেল দেয়া হচ্ছে না। গত দুইদিন ধরে কৃষকরা হন্যে হয়ে ছুঁটছেন তেলের জন্য। কিন্তু কোথাও তেল পাচ্ছেন না তারা। নিরুপায় হয়ে ইউএনও’র অফিস ও বাসার সামনে দুইদিন ধরে ধরনা দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় তপ্ত রোদে যখন সেচ দেয়ার প্রয়োজন, ঠিক সেই সময়ে কোথাও ডিজেল মিলছে না। ধানে এখন থোড় আসার মোক্ষম বা উপযুক্ত সময়, অথচ সেচযন্ত্রগুলো নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে। গত দুই দিন ধরে গোটা উপজেলায় দেখা দিয়েছে তীব্র ডিজেল সংকট। খুচরা বাজারে তেল নেই, আর উপজেলার একমাত্র ফিলিং স্টেশন থেকে টব ও বোতলে তেল সরবরাহ বন্ধ রাখায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক। বোরো ক্ষেতে সেচ দিতে না পারা এবং পাটের বীজ বপন করতে না পেরে কৃষকদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে মহম্মদপুরের আকাশ-বাতাস।
উপজেলার যশোবন্তপুর গ্রামের কৃষক দবির উদ্দিনের চোখে-মুখে এখন কেবলই দুশ্চিন্তার ভাঁজ। কাকডাকা ভোর থেকে তেলের টব হাতে নিয়ে এক বিভিন্ন বাজারে ঘুরেও এক ছটাক ডিজেল মেলাতে পারেননি তিনি। ক্ষোভ আর কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, দুইদিন ধরে ইউএনও স্যারের কাছে আমরা যাচ্ছি কিন্তু কোনো ফল হচ্ছে না। এই ভরা মৌসুমে ডিজেলের জন্য হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছি। পাটবীজ এখনই বুনতে না পারলে এ বছর আর আবাদ হবে না। আমরা কৃষকরা কি না খেয়ে মরব?
একই অবস্থা নাওভাঙ্গা গ্রামের কৃষক ওমর আলীর। তিনি জানান, ধানে এখন পানি না দিলে চাল হবে না, সব চিটে হয়ে যাবে। বিঘার পর বিঘা বোরো ধান পানির অভাবে রোদে পুড়ছে। কৃষকদের অভিযোগ, উপজেলার একমাত্র ‘এফকে ফিলিং স্টেশন’ থেকে টবে বা বোতলে তেল না দেওয়ার সিদ্ধান্তে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
গত দুইদিন কোথাও ডিজেল না পেয়ে গত বৃহস্পতিবার উপজেলার কয়েক শ’ কৃষক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে যান। সেখান থেকে কোনো সমাধান না পেয়ে শুক্রবার সকালে শত শত কৃষক ফের জড়ো হন ইউএনও’র বাসভবনের সামনে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মেলেনি কোনো আশার বাণী। শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে তাদের। কৃষকদের দাবি, দ্রুত তেল সরবরাহ নিশ্চিত না হলে তাদের মেরুদন্ড ভেঙে পড়বে।
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৫৪ হাজার বিঘা জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৮০ হাজার বিঘা জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রতিদিন এই বিপুল পরিমাণ জমিতে সেচ ও চাষাবাদের জন্য প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন।
উপজেলা কৃষি অফিসার পীযুষ রায় বলেন, বোরো এবং পাট আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই মুহূর্তে সেচ ব্যবস্থা সচল রাখা কৃষকদের জন্য খুবই জরুরি। ডিজেল না পেলে কৃষকের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, খুচরা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। এদিকে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ টবে ও বোতলে তেল না দেওয়ার পেছনে প্রশাসনের নির্দেশনার অজুহাত দিলেও কৃষকরা বলছেন, মাঠের বিশেষ পরিস্থিতিতে নিয়ম শিথিল করা উচিৎ।
তীব্র তাপপ্রদবাহে যখন জনজীবন ওষ্ঠাগত, তখন ডিজেলের এই সংকট মহম্মদপুরের কৃষকদের জন্য ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের ‘সোনালি স্বপ্ন’ এখন ডিজেলের ড্রামে বন্দী। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই জ্বালানি সংকট নিরসন করা না গেলে কেবল ফসলই নষ্ট হবে না বরং হুমকিতে পড়বে এই অঞ্চলের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি। মহম্মদপুরবাসী এখন তাঁকিয়ে আছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের দিকে।
এ বিষয়ে মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুহ: শাহনুর জামান বলেন, আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা চলছে।
মন্তব্য করুন