
আধুনিক প্রযুক্তির জয়জয়কারে পৃথিবী এখন মানুষের হাতের তালুর এক চিলতে কাঁচের পর্দায় বন্দি। স্মার্টফোন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আর স্যাটেলাইট টিভির ঝকঝকে দুনিয়ায় মানুষ যখন প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলাচ্ছে, তখন মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদরের এক কোণে বাস করছেন এমন একজন মানুষ, যিনি সময়ের স্রোতের বিপরীতে এক পাহারাদার। নাম তার মো. সাইফুর রহমান (৬৭)। তিনি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদরের বাজার রাধানগর গ্রামের মৃত: ওসমান শেখের ছেলে। দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে তার নিত্যদিনের সঙ্গী কেবল একটি রেডিয়ো। এই রেডিয়োর নবে আডুল রেখে তিনি যেমন বিশ্বের মানচিত্র ঘুরে বেড়ান, তেমনি ধরে রেখেছেন হারানো দিনের সেই ধ্রুপদী ঐতিহ্য। এলাকার অনেকে তাকে ‘রেডিয়ো ম্যান’ বলে ডাকেন।
দেশ স্বাধীনের পর থেকেই রেডিয়োর সঙ্গে সাইফুর রহমানের এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তিনি যখন রেডিয়োতে নব ঘোরান, তখন ঘরের কোণে জেগে ওঠে নীলিমা সান্যাল কিংবা দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই চিরচেনা কণ্ঠ। ভারতের আকাশবাণী থেকে শুরু করে বাংলাদেশ বেতারের সরকার কবির উদ্দিন কিংবা ইমরুল চৌধুরীর সংবাদ পাঠ-সবই তার নখদর্পণে। এক সময় বিবিসি লন্ডনের সেই গম্ভীর সুর আর সংবাদও ছিল তার নিত্যদিনের পাথেয়।
সাইফুর রহমানের দিনলিপি যেন নিয়ন্ত্রিত হয় রেডিয়োর তরঙ্গ থেকে ভেসে আসা শব্দের ছন্দে। সকাল সাতটায় বাংলাদেশ বেতারের খবর দিয়ে তার দিন শুরু হয়। এরপর সকাল আটটায় শোনেন ভারতীয় সংবাদ। রাত সাড়ে আটটা, নয়টা এবং সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার সংবাদ পরিক্রমা না শুনলে যেন তার তৃপ্তিই হয় না। কেন এই রেডিয়োর প্রতি এত টান? প্রশ্নটি করতেই মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে সাইফুর রহমান বলেন, “টিভির সামনে তো খুঁটি গেড়ে বসে থাকতে হয়। রেডিয়োতে সেই ঝামেলা নেই। শুয়ে, বসে কিংবা কাজ করতে করতেও সব জানা যায়। এমনকি খবর শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যাই, টেরও পাই না।”
রেডিয়োর প্রতি তার এই অনুরাগ কেবল সংবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি ও পুরোনো দিনের সেই ক্ল্যাসিক বাংলা গানগুলো যখন রেডিয়োতে বাজে, তখন সাইফুর রহমান ফিরে যান তার ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোতে। ধর্মপ্রাণ এই মানুষটি রেডিয়োতে কোরআন-হাদিসের আলোচনা শোনেন গভীর মনোযোগে। রমজান মাসে ধর্মীয় বয়ান শোনেন ভক্তি সহকারে। রেডিয়োতে ভেসে আসা আযান শুনেই তিনি নামাজের প্রস্তুতি নেন। তিনি মনে করেন, টেলিভিশনের পাশ্চাত্য সংস্কৃতির চাকচিক্য থেকে রেডিয়ো তাকে মুক্ত রাখে।
এই রেডিয়ো প্রেমের আরও একটি মধুর দিক আছে। সাইফুর যখন রেডিয়োতে গানের অনুষ্ঠান শোনেন, তখন তার নাতি-নাতনিরা চারপাশে ভিড় জমায়। গানের ছন্দে যখন ছোট ছোট শিশুরা নাচতে শুরু করে, তখন দাদা হিসেবে তার আনন্দ যেন আকাশ ছোঁয়। এটি কেবল একটি যন্ত্র নয় বরং পরিবারের প্রজন্মের মধ্যে এক আত্মিক বন্ধনের সেতু।
যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কখনও রেডিয়োটি অকেজো হয়ে পড়লে তার মন অস্থির হয়ে ওঠে। মহম্মদপুরে মেরামতের সুযোগ না থাকলে তিনি ছুটে যান পাশের ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলায়। পরম মমতায় মেরামত করে আবার সচল করে আনেন তার প্রিয় সাথিকে।
সাইফুর রহমানের এই যাপন বর্তমান সময়ের সাপেক্ষে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, “আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ এখন ফোন আর অনলাইনে ডুবে আছে। এখন রেডিয়ো শোনার মানুষ আর ক’জন আছে জানি না। তবে আমি আমার পুরোনো ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রেখেছি। এটিই আমাকে শান্তি দেয়।”
মহম্মদপুর উপজেলা সদরের বাজার রাধানগর গ্রামের এই মানুষটি আমাদের মনে করিয়ে দেন, সব নতুনের নেশা যেমন ভালো নয়, তেমনি সব পুরোনোই ফেলনা নয়। প্রযুক্তির দ্রুত বদলে যাওয়ার যুগে সাইফুর রহমানের এই ‘রেডিয়ো ম্যান’ হয়ে ওঠা কেবল একটি শখ নয় বরং আমাদের শিকড় ও ঐতিহ্যের প্রতি এক গভীর আনুগত্যের প্রতীক।
মন্তব্য করুন