
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ভূমিসেবা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার হলেও মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোনো লিখিত আদেশ, সরকারি প্রজ্ঞাপন বা আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই জেলা প্রশাসকের ‘মৌখিক নির্দেশে’ দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে নামজারি (মিউটেশন) ও ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) আদায়।
এই প্রশাসনিক অচলাবস্থায় জিম্মি হয়ে পড়েছেন মধুমতি নদী তীরবর্তী ৫টি মৌজার শত শত জমির মালিক। যদিও স্থানীয় ভূমি দপ্তরের একটি পক্ষ দাবি করছে, এই স্থগিতাদেশ কার্যকর রয়েছে মাত্র তিন মাস ধরে।
সূত্রমতে, উপজেলার ৮১ নম্বর মুরাইল পশ্চিম খন্ড, ৮২ নম্বর ধুপুড়িয়া, ৮৩ নম্বর পশ্চিম চরবর্ণি, ৮৪ নম্বর জাঙ্গালিয়া এবং ৮৫ নম্বর রুইজানি; এই ৫ মৌজায় যেন অঘোষিত ‘লকডাউন’ চলছে। জমি কেনাবেচা থেকে শুরু করে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ সবই স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনেও সম্পত্তি কাজে লাগাতে পারছেন না মালিকরা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে নিষেধাজ্ঞার ধরণ নিয়ে। কোনো গেজেট, সার্কুলার বা আইনি নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই দীর্ঘ দেড় বছর ধরে ৫টি মৌজার অন্তর্গত জমি মালিকদেরকে ভূমিসেবা থেকে বঞ্চিত রাখা কতটা আইনসম্মত, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভূক্তভোগিরা।
সূত্র জানায়, পূর্ববর্তী জেলা প্রশাসকের ‘মৌখিক’ নির্দেশে ৫টি মৌজার নামজারি (মিউটেশন) ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায় স্থগিত রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী-আদালতের সুনির্দিষ্ট স্থগিতাদেশ বা বিশেষ সরকারি প্রজ্ঞাপন ছাড়া কোনো নাগরিকের নামজারি বা খাজনা গ্রহণ বন্ধ রাখার এখতিয়ার কোনো কর্মকর্তার নেই। ‘মৌখিক নির্দেশে’ সেবা বন্ধ রাখা সরাসরি সংবিধানের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। তবে স্থানীয় ভূমি দপ্তর বলছেন, ১৯৫৫ সালের স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি (৮৬-৮৭, এসএনটি) অ্যাক্ট অনুযায়ী মধুমতি নদী তীরবর্তী মুরাইল পশ্চিম খন্ড, ধুপুড়িয়া, পশ্চিম চরবর্ণি, জাঙ্গালিয়া এবং রুইজানি মৌজার ভূমিসেবা স্থগিত রয়েছে।
জাঙ্গালীয়া গ্রামের ভুক্তভোগী আলতু মিয়া বলেন, ‘নামজারি ও খাজনা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় টাকার প্রয়োজনেও আমরা জমি বিক্রি করতে পারছি না। ফলে আমরা ভোগান্তি ও ক্ষতির শিকার হচ্ছি। স্বাভাবিক ভূমি সেবা চালুর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
মহম্মদপুর সদর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা খাঁন আজমারুল হক জানান, ১৫-২০ বছর পূর্বে উল্লিখিত ৫টি মৌজায় ভূমি জরিপের (রেকর্ড) কার্যক্রম শুরু হলে মাগুরা ও ফরিদপুর জেলার আন্ত:সীমানা বিরোধ জটিতায় তা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর নতুন করে আর ভূমি জরিপ বা রেকর্ড কার্যক্রম হয়নি।
ভূমি সংশ্লিষ্ট দপ্তর বলছে, ১৯৬২ সালে এসএ রেকর্ডের পর মধুমতি নদী তীরবর্তী মুরাইল পশ্চিম খন্ড, ধুপুড়িয়া, পশ্চিম চরবর্ণি, জাঙ্গালিয়া এবং রুইজানি মৌজায় ভূমি জরিপ হয়নি। এরপর ভাঙণের মুখে নদীর গতিপথ এলাকা বিশেষ এক থেকে দেড় মিলোমিটার পশ্চিমে সরে এসেছে। ফলে নদী সীকস্তি-পয়স্তি মৌজাগুলোতে ভূমিসেবা স্থগিত রয়েছে।
উপজেলা ভূমি অফিসের অফিস সহাকরী কাম কম্পিউটার অপারেটর এনামুল হক চৌধুরী জানান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদমান আকিফ স্যার ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর মহম্মদপুরে যোগদানের পর সপ্তাহ খানেক অফিস করেছেন। তারপর তিনি ৫ মাসের জন্য ভূমি সংক্রান্ত বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় রয়েছেন। তাঁর আগের সহাকরী কমিশানর (ভূমি) বাসুদেব মালো স্যার ৫ মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ শেষ করার পর বদলির আদেশে অন্য কর্মস্থলে চলে যান। ফলে প্রায় ১০ মাস স্থায়ীভাবে কোনো এসিল্যান্ড এই স্টেশনে নেই। বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহ: শাহনুর জামান ওই পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন।
উপজেলা ভূমি অফিসের ক্রেডিট চেকিং কাম সায়রাত সহকারী আনিচুর রহমান জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নামজারির (মিউটেশন) জন্য প্রায় ৩ হাজার আবেদন জমা পড়ে। যারমধ্যে প্রায় ২ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, নদী সিকস্তি মুরাইল পশ্চিম খন্ড, ধুপুড়িয়া, পশ্চিম চরবর্ণি, জাঙ্গালিয়া এবং রুইজানি মৌজার বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভের (বিডিএস) কার্যক্রম দ্রুতই শুরু হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহ: শাহনুর জামান বলেন, ‘সরকারি স্বার্থ রক্ষায় আপাতত: আন্ত:সীমানা বিরোধীয় এবং নদী সিকস্তি ৫টি মৌজার ভূমিসেবা স্থগিত রয়েছে। তবে শিগগিরই ভূমি জরিপ শুরু হবে, তখন তাদের সমস্যা দূর হয়ে যাবে।’
এদিকে দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে এবং ভূমি বিরোধ জটিলতা কমাতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ বা বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে কার্যক্রম (বিডিএস) আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় মহম্মদপুর উপজেলার নির্দিষ্ট নদী সিকস্তি মুরাইল পশ্চিম খন্ড, ধুপুড়িয়া, পশ্চিম চরবর্ণি, জাঙ্গালিয়া এবং রুইজানি মৌজায় ডিজিটাল জরিপ পরিচালনার প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ-২ শাখা থেকে প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর সহকারী সচিব মো: ইব্রাহীম মিয়াজী স্বাক্ষরিত এই আদেশে ‘দ্য সার্ভে অ্যাক্ট, ১৮৭৫’ এবং ‘দ্য স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট, ১৯৫০’-এর সংশ্লিষ্ট ধারা মোতাবেক এই অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন