
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মাগুরার রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাাম শেষে ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের কবল থেকে মুক্ত হয় মাগুরা। আকাশে ওড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তিম পতাকা। এটি শুধু একটি এলাকার মুক্তি নয়, এটি মাগুরার দামাল ছেলেদের বীরত্ব আর বাঙালির অদম্য স্পৃহার এক উজ্জল ইতিহাস।
মাগুরার মুক্তিযোদ্ধারা তৎকালীন বৃহত্তর মাগুরা ও ঝিনাইদহ মহকুমা ছাড়াও ফরিদপুর জেলার একটি অংশকে শত্রুমুক্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাদের বীরত্বপূর্ণ গেরিলা যুদ্ধের অনেক ঘটনা সেসময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেও প্রচারিত হয়েছিল, যা রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল।
৭১-এর মার্চ মাসের শেষ দিকে পাক বাহিনী ও তাদের দোসররা মাগুরায় প্রবেশ করে। শহরের এক পাগল ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দেওয়ায় তাকেই প্রথম গুলি করে হত্যা করা হয়। হানাদার ও তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকার-আলবদররা শহরের পিটিআই, সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, আনসার ক্যাম্প ও ডাকবাংলোসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘাঁটি গেড়ে নৃশংস অত্যাচার-নির্যাতন, গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগ চালাতো।
মাগুরার ওয়াপদা ব্যারেজ, ক্যানেল ও পিটিআই ছিল পাকবাহিনী ও হানাদারদের প্রধান বধ্যভূমি। তারা সেখানে শত শত মানুষকে হত্যা করে।
ছয়ঘরিয়ায় ১৩ মুক্তিযোদ্ধার গণকবর, হাজরাহাটিতে ৭ মুক্তিযোদ্ধার এবং তালখড়িতে ৭ মুক্তিযোদ্ধার গণকবর রয়েছে। যা তাঁদের আত্মত্যাগের গৌরবময় সাক্ষ্য বহন করে। ডিসেম্বর মাস শুরু হতেই মাগুরার মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করে।
মাগুরার বিভিন্ন এলাকায় পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ কয়েটি সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এগুলোর মধ্যে মহম্মদপুর উপজেলা সদরের যুদ্ধ, জয়ারামপুর যুদ্ধ ও বিনোদপুর যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। এসব যুদ্ধে শহীন হন মহম্মদপুরের আপন দুই সহোদর আহম্মদ-মহম্মদ ও আবীর, যশোরের সতিঘাটা-কামালপুর এলাকার ইপিআর সদস্য মহম্মদ উল্লাহ্ এবং শ্রীপুরের মুকুল।
৬ ডিসেম্বর যশোর শত্রুমুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তানি সেনাদের একটি বড় অংশ মাগুরায় পালিয়ে আসে।
মুক্তিযোদ্ধাদের লাগাতার গেরিলা হামলা এবং মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা।
প্রবল প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকেই পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা মাগুরা শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করে।
১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর ভোর হওয়ার আগেই পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা গড়াই নদী পার হয়ে ফরিদপুরের কামারখালী অভিমুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
ঐতিহাসিক ৭ ডিসেম্বর প্রত্যাশিত মুক্তির আনন্দে জয়োল্লাসে ফেটে পড়েন। গোটা শহরে নেমে আসে জনতার ঢল। বীর শহীদদের রক্তে কেনা বিজয়ের আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে মাগুরা শহর। মাগুরা মুক্ত দিবস প্রতি বছর আমাদের সাহস, আত্মত্যাগ এবং বিজয়ের গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
মন্তব্য করুন