
হাজারো মানুষের চোখে জল, হা-হুতাশ, আর্তনাদ আর কাগজপত্র ছুঁড়ে ফেলা যশোরে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ হাউজিং এস্টেটের পরিচালনা করা দু’দিনের অভিযানই প্রশ্নবিদ্ধ। এখানে উচ্ছেদ বিধি মানা হয়নি। জানানো হয়নি যশোরের জেলা প্রশাসককে। এমনকি যশোরের ম্যাজিট্রেট পর্যন্ত নেয়া হয়নি। করা হয়নি বিধি মোতাবেক নোটিশ। বিধি অনুযায়ী হাইজিং ৭ দিন আগে একটি নোটিশ করবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষে আরো একটি নোটিশ করা হবে। কিন্তু জেলা প্রশাসকের অজ্ঞাতে নোটিশ কার্যক্রমে ঘাপলা করে অভিযান চলেছে। এখানে নোটিশ বিধি ভুলুণ্ঠিত হয়েছে। দু’দিন ধরে চলা এই উচ্ছেদ অভিযানকে সম্পূর্ণ অবৈধ দাবি করে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান জানিয়েছেন, বৈধ কাগজপত্র থাকা সকলকে সহযোগিতা করবে জেলা প্রশাসন। এদিকে, উচ্ছেদের শিকার লোকজনের মধ্যে নিজেদের কাগজপত্র বৈধ দাবি করা অনেকেই প্রতিদিনই যশোরের জেলা প্রশাসকের দপ্তরে প্রতিকার দাবি করছেন। হাউজিংয়ের উচ্ছেদ কার্যক্রমের আওতায় পড়া ৪ শতাধিক ঘরবাড়ির মধ্যে ইতিমধ্যে ৫ জনের বৈধ কাগজপত্র আছে বলে তথ্য মিলেছে। তারা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেবেন। এছাড়াও ঢাকা সেগুনবাগিচা হাউজিংয়ের চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও করাসহ মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন তারা। গত ১০ ও ১১ মে যশোরে ৪ শতাধিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে ৫০ কোটি টাকা মূল্যের ৫ একর সম্পত্তি উদ্ধার করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। গত রোববার সকাল থেকে শুরু হয়ে সোমবার সন্ধ্যায় এই অভিযান শেষ হয়। অভিযানে উপশহর গাবতলা মোড়, উপশহর খাজুরা স্ট্যান্ড সংলগ্ন শিশু হাপাতালের পাশে, বি ব্লক ও উপশহর ইউনিয়ন পরিষদ ও শেখহাটি এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। দুই দিনব্যাপি অভিযানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের তিনটি আঞ্চলিক কার্যালয়সহ ৪ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। হাউজিং এস্টেট যশোরের দেয়া দায়মুক্তি সনদ, রেজিস্ট্রি দলিল, খাজনা ট্যা´ প্রদানের যাবতীয় কাগজপত্র থাকা সত্তেও উচ্ছেদের নামে অনেকের বাড়ি ঘর দোকান ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় একটি কুচক্রি মহলের ইন্ধনে জালিয়াতির মাধ্যমে অনেকের প্লটে থাকা স্থাপনাগুলো গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং সকল কাগজপত্র উপস্থাপন করলেও তা কর্ণপাত না করে হাউজিং এস্টেট অনেকের শেষ সম্বল মাথাগোঁজার ঠাঁই বাড়ি টুকু কেড়ে নেয়ার পায়তারা করছে বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে অনেকে অভিযোগ তোলেন জেলা প্রশাসকের কাছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ যশোরের সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন হাউজিং এস্টেটের সরকারি জমি দখল করে গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন স্থাপনা। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অবৈধ দখলদারদের জমি ছেড়ে দিতে একাধিকবার নোটিশ দেয়া হয়। সর্বশেষ শনিবার স্থাপনা সরিয়ে নিতে এলাকায় মাইকিং করা হয়। এরপর রোববার সকাল ৯টায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের খুলনা বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। দ্বিতীয় দিনের অভিযানে উপশহর বালিকা বিদ্যালয় এলাকা থেকে অভিযান শুরু হয়। এসময় একটা চারতলা ভবনের একাংশ ভেঙে ফেলা হয়। এরপর ডি ব্লক স্কুল প্রাঙ্গনে এক নারী ইউপি সদস্যর টিনসেডের চারটি ঘর উচ্ছেদ করে। এরপর ঘোপ কবরস্থানের পাশের দু’টি গ্যারেজ ভেঙে ফেলা হয়। পরে শিশু হাসপাতালের পাশ থেকে তিনটি দোকান ও একটি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়। মার্কাস মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বড় ইট ও সিমেন্টের দোকান গুড়িয়ে দেয়া হয়। সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো যশোরের উপশহর হাউজিং এস্টেটে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এছাড়া উপশহর এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনের সামনে সরকারি জায়গা দখল করে রাখা সাইনবোর্ড ও টিনশেড ঘর ভেঙে দেয় উচ্ছেদকারী দল। একই এলাকায় সরকারি জমির ভেতরে অংশ পড়ায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কিছু অংশও ভেঙে ফেলা হয়। অভিযানে ই ব্লক এলাকায় একটি দোকান ও একটি বাড়ি উচ্ছেদ করা হয়েছে। একই ব্লকে আরও দুটি বাড়ির দেয়াল ও বারান্দার অংশ ভাঙা হয়। এছাড়া বিএনপির একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট মোড় পুকুরপাড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৫টি দোকান উচ্ছেদ করা হয়। একই এলাকার পুকুরের পেছনে অবস্থিত দুটি বাড়িও ভেঙে ফেলা হয়েছে। বারান্দীপাড়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় একটি বাড়ির দেয়াল ভাঙা হয়। আওয়ামী লীগের দুটি অস্থায়ী কার্যালয় ভাঙা হয়। সব মিলিয়ে ওই দু’দিনের অভিযানে ৪শ’ ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা হয়। এতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা মুল্যের ৫ একর সম্পত্তি উদ্ধার হয়। যদিও অভিযানের সময় হাউজিং কর্তৃপক্ষকে এবং পরে অনেকেই যশোরের জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেন, তাদেরকে কোনো পূর্ব নোটিস ছাড়াই উচ্ছেদ করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকজন অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের আমলে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ইমাদুল ইসলাম তুহিনসহ কয়েক কর্মকর্তা টাকা নিয়ে তাদের সেখানে বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এখন হঠাৎ করে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করায় শতাধিক পরিবার বিপাকে পড়েছেন। এদিকে, গত ১০ ও ১১ মে অভিযানকে ঘিরে জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন মহলে শুরু হয়েছে নানামুখি আলোচনা ও কঠোর সমলোচনা। খোদ জেলা প্রশাসককে না জানিয়েই এই দু’দিনের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এমনটি যশোর থেকে ম্যজিস্ট্রেট পর্যন্ত নেয়া হয়নি। যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান জানিয়েছেন, হাউজিংয়ের ১০ ও ১১ মের ওই অভিযান একেবারে অবৈধ বলা যেতে পারে। তাকে অবহিত করাই হয়নি। কোনো জেলায় উচ্ছেদ অভিযানের নিয়ম হচ্ছে সেই জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অর্থাৎ ডিসিকে অবহিত করতে হবে। উচ্ছেদ প্রয়োজনীয়তা যথাযথ হলে তিনি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেবেন। এছাড়া এসপির কাছে পুলিশ ফোর্স চাইবে। কিন্তু হাউজিং তাকে না জানিয়ে বাইরে থেকে ম্যাজিস্ট্রেট এনে হঠাৎ করে অভিযান চালিয়েছে। বিধি অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনার বিপরীতে হাউজিং পক্ষ থেকে ও ম্যাজিস্ট্র্রেটের পক্ষে একটি করে দুটি নোটিশ কমপক্ষে ৭ দিন আগে পাঠাতে হবে লিখিতভাবে। কিন্তু এ বেলায় তা হয়নি। কাজেই ওই অভিযানের কোনো প্রকার বৈধতা নেই। এখন অনেকেই কাগজপত্র নিয়ে তার কাছে আসছেন, কাগজপত্র দেখিয়ে ন্যায় বিচার চাচ্ছেন। তিনি জানিয়েছেন, বৈধ কাগজপত্রধারীদের অবশ্যই জেলা প্রশাসনেরর পক্ষে সহযোগিতা করা হবে। এদিকে ভুক্তভোগী রুমা খাতুন, বাবু, তাামিম রহমাম, তালেব, কামরুল ইসলাম, দুটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষসহ কমপক্ষে ৫০ ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের দাবি বৈধ কাগজ পত্র হালনাগাদ রয়েছে, এরপরও তাদের উচ্ছেদ পায়তারা করা হয়েছে। তারা এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন। একইসাখে ঢাকা সেগুন বাগিচায় চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও করবেন, প্রয়োজনে মামলা করবেন। বৈধ টাকায় কেনা এক টুকরো জমিও ছেড়ে দেয়া হবে না রক্ত চোষা হাউজিংকে। ওষুধ ব্যবসায়ী লাকী তনু জানিয়েছেন, হঠাৎ গত ১১ মে সকালে এস্কেভেটর দিয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ হাউজিং এস্টেট চালিয়েছে উচ্ছেদ তৎপরতা। মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় যশোর শিশু হাসপাতালের পাশে তাদের ফার্মেসি। দোকানের ১০ লাখ টাকার ওষুধ নষ্ট হয় বলে দোকানীদের অভিযোগ। এছাডা আঞ্জুয়ারা বেগমের বাড়িতে দুষ্টু চক্রের লোকজন ঢুকে নগদ টাকা ও মাল নিয়ে যায়। ভুক্তভোগী আঞ্জুয়ারা বেগম জানান, তিনি যশোর শিক্ষা বোর্ড কর্মচারী সৈয়দ আহমেদের কাছ থেকে প্লটটি ক্রয় করেছিলেন। হাউজিং কর্তৃপক্ষ থেকে প্লটটির বিপরীতে দায় মুক্তি সনদ রয়েছে। এরপরও হাউজিং কর্তৃপক্ষ ১১ এপ্রিল সকালে বেগমের বাড়ি ঘর ভেঙে দেয়। এ সময় তিনি সকল বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শন করলেও তাতে কর্ণপাত করেননি হাউজিং কর্তৃপক্ষ। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। এ ব্যাপারে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের খুলনা বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৗশলী জিয়াউর রহমান জানিয়েছেন, জেলা প্রশসককে জানিয়ে সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচাললিত হয়েছে। আদালতে মামলা স্টে ওয়ার্ডার এমন কোনো কাগজপত্র কেউ উপস্থাপন করেনি। এছাড়া সরাসরি জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারমান স্যারের নির্দেশনায় অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ৫ একর সরকারি সম্পদ উদ্ধার হয়েছে। নোটিশ করা হয়েছে। বার বার মাইকিং করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়েছে। এখন নানা ধরনের টালবাহানা করছেন অবৈধ দখলদাররা।
মন্তব্য করুন