
মা ছোট্ট একটি শব্দ, তবে তাকে একটি শব্দে বা একটি লাইনে বিশ্লেষণ বা বর্ণনা করা কঠিন। মা শব্দের এমনি বিশাল ব্যাপ্তি। মা তিনি, যিনি তার জীবনের শেষ পর্যন্ত শুধু দিয়েই যান। বিনিময়ে আশা করেন না কিছু চান না কিছুই। বাঙালি সমাজ সংসারে অবহেলিত সে মা কখনো ভাবতেই পারেননি তারজন্যও কোন বিশেষ দিবস হতে পারে। যে দিবসটি এখন বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়ে আসছে মায়ের সীমাহীন ত্যাগ তিতিক্ষাকে সম্মান জানাতে। মায়েদের নিয়ে প্রতি বছর বর্ণাঢ্য আয়োজন করে আসছে যশোরের সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন শেকড়। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া শেকড়ের এ আয়োজন যা এবারে ১৯ বছরে পর্দাপন করলো। সময়ের পরিক্রমায় যশোরবাসীর ভালোবাসার এক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে শেকড় আয়োজিত মায়েদের সমাবেশ ও রত্নগর্ভা মায়েদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান। বরাবরের মতো মা দিবস অনুষ্ঠানে থাকে যশোরবাসীর স্বতস্ফূর্ততা, এবারেও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
গ্রীষ্মের দাবদাহ উপেক্ষা করে রোববার শেষ বিকেল থেকেই বাঁচতে শেখা মিলনায়তনে বিভিন্ন বয়সী মানুষ আসতে থাকেন। মা কে নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শকরা আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করেন। অনুপ্রাণিত হন নিজ মাকে আরও ভালোবাসার এবং আরও সম্মান জানানোর। গানে গানে, নৃত্য, কবিতার পঙতিমালা ও আলোচনায় মাকে উপজীব্য করা হয়। মাকে নিয়ে এমনি প্রাণবন্ত ছিল গোটা মা দিবস অনুষ্ঠান। এবারে পাঁচ জন রত্নগর্ভা মা সম্মাননা পান। তারা হলেন, শাহানারা বেগম, শামসুন্নাহার বেগম, জুলেখা খাতুন, আফরোজা হক, মাহমুদা বেগম। এছাড়া সর্বজয়ী মায়ের খেতাব অর্জন করেন বাঁচতে শেখার প্রতিষ্ঠাতা অ্যাঞ্জেলা গোমেজ। অনুষ্ঠানে মায়েরা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেন, অনুভূতি প্রকাশ ও স্মৃতিচারণ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মা দিবস উদযাপন পর্ষদের আহবায়ক হাবিবা শেফা। প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক পৌরমেয়র মারুফুল ইসলাম মারুফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডক্টর মোস্তাফিজুর রহমান, যশোর ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক এ.জেড.এম সালেক। মুখ্য আলোচক ছিলেন যশোর ইনস্টিটিউটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন, মা দিবস উদযাপন পর্ষদের যুগ্ম-আহবায়ক অর্চনা বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হারুন-অর-রশিদ। উপস্থিত ছিলেন, মহিলা পরিষদ নেত্রী অধ্যাপক সুরাইয়া শরীফ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক কর্মকর্তা আব্দুল খালেক, শিক্ষক আসমানা রলি। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানের সার্বিক সহযোগিতা করে বাঁচতে শেখা ও সামাজিক সংগঠন স্বপ্নতরী যশোর। শেকড়ের শিল্পীবৃন্দ ও স্বপ্নতরীর বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু কিশোরদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘আমরাও পারি’ পরিবেশিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মারুফুল ইসলাম মারুফ বলেন, ইন্টারনেটের এ যুগে সন্তানদের উপযুক্ত মানুষ রূপে গড়ে তোলা অভিভাবকদের পক্ষে কঠিন হচ্ছে। চাইলেই তারা এটি পারছেন না। তবু আমাদের বাবা মায়েদের সন্তানকে গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, একদিন নয়, বছরের প্রতিটি দিনই মা-বাবাকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানানোর দিন। সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন শেকড় সাধারণ সম্পাদক রওশন আরা রাসু। একনজরে সম্মাননা প্রাপ্ত পাঁচজন মা
শাহানারা বেগম : রত্নাগর্ভা মা শাহানারা বেগম যশোরের কেশবপুরের ১৯৮২ সালে ১৫ বছর বয়সে গোপালগঞ্জের পাটকান্ডি গ্রামের সেনা কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের তিন বছর পরে স্বামী অসুস্থ হলে সংসারের হাল ধরেন। তিনি যশোর হোমিওপ্যাথিক কলেজে অধ্যয়ন শেষে ডাক্তার হন এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন চার সন্তানকেও ডাক্তার হিসেবে গড়ে তুলবেন। তার চার সন্তান ডা.ফারহানা রহমান, ডা. সানজানা রহমান, ডা. হাদিউর রহমান ও ডা. ফারিয়া রহমান।
শামসুন্নাহার বেগম : রত্নগর্ভা মা শামসুন্নাহার বেগম ১৯৫৮ সালের ২ জুন জন্মগ্রহণ করেন। যশোর শহরের পুরাতন কসবা কাজীপাড়ার খন্দকার কামরুল ইসলামের সাথে ১৯৭৮সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, তাদের তিন সন্তান। প্রথম সন্তান খন্দকার খালদুন ইসলাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, দ্বিতীয় সন্তান খন্দকার আশিকুল ইসলাম যশোর বিএএফ শাহিন কলেজের সিনিয়র শিক্ষক, তৃতীয় সন্তান খন্দকার জুলকার ইসলাম মিডফোর্ড হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কর্মরত।
জুলেখা খাতুন : রত্নগর্ভা মা জুলেখা খাতুন ১৯৭৭ সালে যশোর নিবাসী জজ মিয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সাত সন্তান। প্রথম সন্তান রফিকুল ইসলাম যশোর সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যাপনা করছেন। দ্বিতীয় সন্তান সেলিম রেজা অগ্রণী ব্যাংক যশোর বাজার শাখায় কর্মরত। তৃতীয় সন্তান আয়েশা সিদ্দীকা যশোর হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজে কর্মরত। চতুর্থ সন্তান ফারজানা ইয়াসমিন গৃহিনী, পঞ্চম সন্তান কামরুজ্জামান মাগুরা আড়পাড়া কলেজে ব্র্যাক শাখায় ক্রেডিট অফিসার। ষষ্ঠ সন্তান আলমগীর কবির দর্শনা থানার সাবইন্সপেক্টর। সপ্তম সন্তান আসাদ রেজা অনিপ মাগুরা থানার সাবইন্সপেক্টর।
আফরোজা হক : আফরোজা হক যশোরের ঘোপ নওয়াপাড়ায় ১৯৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৫সালে কাজী জাফরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষিকা। কাজী জাফর ও আফরোজা হক দম্পতির তিন সন্তান। প্রথম সন্তান নুসরাত জারিন আফরোজ গৃহিনী। দ্বিতীয় সন্তান নুসরাত তাসনিয়া আফরোজ ডাক্তার। তৃতীয় সন্তান নুসরাত তাসফিয়া আফরোজ যশোর জজকোর্টে আইনজীবী হিসেবে কর্মরত।
মাহমুদা বেগম : মাহমুদা বেগম ১৯৬৫ সালে খুলনার দৌলতপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যশোর শহরের ঘোপ নিবাসী আখের আলীর স্ত্রী। তাদের তিন সন্তান। প্রথম সন্তান আসমা খাতুন গৃহিনী। দ্বিতীয় সন্তান মাসুদ হোসেন মোবাইল কোম্পানী রবি’তে কর্মরত। তৃতীয় সন্তান মাহবুবুর রহমান ইকিউএমএস কনসালটিং লিমিটেডে কর্মরত।
মন্তব্য করুন