
তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেব, নেপোলিয়নের প্রখ্যাত উক্তির বাস্তবতা দেখিয়েছেন কেশবপুর পৌরসভার ৭নং মধ্যকুল ওয়ার্ডের একজন মা শাহানারা বেগম। বিখ্যাত এই উক্তিটির সঙ্গেই মিলেছে তার জীবন। চার চিকিৎসক সন্তানের জননী একজন সফল মা। প্রতিটি সন্তানই শেষ করেছে উচ্চ শিক্ষা। ৩ জন বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে চাকরিও করছেন সরকারি হাসপাতালে। চার সন্তানের কেউ চট্টগ্রাম ভেটেরিনারী বিশ্ববিদ্যালয়, কেউ খুলনা মেডিকেল কলেজ, কেউবা আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ, কেউ বরিশাল শের এ বাংলা মেডিকেল কলেজসহ দেশ বিদেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অধ্যায়ন শেষ করেছেন।
চার সন্তানই যেন পৌঁছে গেছে সফলতার শেষ প্রান্তে। আর এর পেছনে শক্ত হাতে হাল ধরে রেখেছেন যিনি তিনি রত্নগর্ভা হোমিও চিকিৎসক শাহানারা বেগম। তাই তো এই রত্নগর্ভা মায়ের এক সন্তানের কথায় ফুটে উঠেছে ‘মা আমাদের মাঝে দায়িত্ব আর আদর্শের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। তাই হয়তো কখনো পথ হারা হইনি আমরা।’
এই রত্নগর্ভা মায়ের চার সন্তান হলেন- ডা. ফারহানা রহমান শম্পা, ডা. সানজানা রহমান লোপা, ডা. হাদিউর রহমান সিয়াম ও ডা. ফাহরিয়া রহমান ত্রোপা। তাদের পিতা মো. হাবিবুর রহমান। এক সময় পরিবারের দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের সন্ধানেই যার কেটে গেছে সারাটা দিন। সন্তানদের লেখাপড়ার পেছনে দিতে পারেননি একবিন্দু সময়ও। মায়ের প্রবল চেষ্টায় আজ সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন প্রতিটি সন্তান। এ ছাড়া শুধু নিজের সন্তানরাই নয়, এ পরিবারের তিন মেয়ে, তিন জামাই, ছেলে ও বৌমা সকলেই ডাক্তার। মা শব্দটি ছোট্ট হলেও, দায়িত্ব বিশাল। মমতা, আশ্রয়, নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা ও নির্ভরতা সবই রয়েছে এই একটি শব্দের মাঝে। এই মা-ই কঠোর পরিশ্রম এবং নিজের স্বপ্নের মাঝেই সুশিক্ষা দিয়ে সন্তানকে গড়ে তোলেন। এতে সন্তানরা দেশে-বিদেশে হয় আলোকিত। আর সন্তানের আলোয় আলোকিত হয় মায়ের মুখ।
এই চার সন্তানের জননীরও আলোকিত হয়েছে মুখ। তারা ভোলেনি মায়ের অবদানের কথা। তাদের মুখে সব সময় মায়ের জয়গান। চক্ষু চিকিৎসক বাবাকে সংসারের জন্য ব্যস্ত সময় পার করতে হওয়ায় সন্তানদের সবকিছুরই হাতে খড়ির হাল ছিল মায়ের হাতে। মায়ের এই অনস্বীকার্য অবদানে চার সন্তানের মাথার মণি হয়ে রয়েছেন এই মা। এই রত্নগর্ভার প্রথম সন্তান ফারহানা রহমান শম্পা চট্টগ্রাম ভেটেরিনারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিভিএম পাশ করে বেলজিয়ামের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এস করেছেন। বর্তমান মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রোগতত্ব গবেষক পদে কর্মরত।
দ্বিতীয় সন্তান সানজানা রহমান লোপা খুলনা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে গাইনী বিষয়ে এমএস করেছেন। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন হিসেবে কর্মরত।
তৃতীয় সন্তান হাদিউর রহমান সিয়াম ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেছেন। বর্তমান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় বাংলাদেশ মেডিকেল (পিজি) বিশ্ববিদ্যালয়ে এফসিপিএস করছেন। সবার ছোট ফাহরিয়া রহমান ত্রোপা বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল (পিজি) বিশ্ববিদ্যালয়ে রেডিওলজি বিষয়ে এমডি করছেন।
এ ছাড়াও বড় জামাই ডা. মাহাবুবুল আলম একটি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার বাংলাদেশ অফিসে কর্মরত। মেঝ জামাই ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বাংলাদেশ মেডিকেল (পিজি) বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ছোট জামাই ডা. জাহিদুর রহমান ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে কর্মরত। একমাত্র বৌমা ডা. আদিবা হাবিব খুলনা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার। রত্নগর্ভা শাহানারা বেগম গ্রামের কাগজকে জানান, তার জন্ম গোপালগঞ্জ শহরে। নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন ১৯৮০ সালে ওই এলাকার পাইককান্দি গ্রামের মো. হাবিবুর রহমানের সাথে তার বিয়ে হয়। স্বামী তখন যশোর সেনানিবাসে আর্মি মেডিকেল কোরে চক্ষু বিভাগের মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্ট পদে কর্মরত।
৮২ সালে এসএসসি পাশ করে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজে ভর্তি হন। এরই মাঝে স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি চলে আসেন যশোরে। গুরুতর অসুস্থতার কারণে ৮৪ সালে তার স্বামীকে চাকরি থেকে অবসর নিতে হয়। এরপর বাসায় স্বামীকে সেবা-চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি যশোর হোমিওপ্যাথিক কলেজে ভর্তি হন।
এরপর তার অপটিক্যাল ব্যবসায়ী এক ভাইয়ের কেশবপুরে অবস্থানের কারণে ৮৫ সালে তারা চলে আসেন কেশবপুরে। ডিএইচএমএস পাশ করে বাসাতেই হোমিও প্রাকটিস শুরু করেন। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে স্বামী হাবিবুর রহমানও ওই ভাইয়ের চশমার দোকানে বসে শুরু করেন চোখের রুগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া।
এ ভাবেই শুরু হয় স্বামী-স্ত্রীর সংগ্রামী জীবনের গল্প। আর সংগ্রাম করতে করতে তাদের সংসারে আসে ৩ মেয়ে ১ ছেলে। সন্তানদের লালন পালনের পাশাপাশি রুগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার সময় তিনি ঠিকই বুজেছিলেন, শিক্ষাই কেবল প্রতিদিনের সংগ্রাম থেকে বের করে আমাদের সুন্দর জীবন দিতে পারে। তাই সারা দিন পরিশ্রম করার পর শরীরের ক্লান্তিকে দূরে রেখে তার ছেলেমেয়েদের বই নিয়ে বসাতে ভুলতেন না।
তিনি আরও বলেন, অসুস্থ মানুষকে সুস্থ্য করে তোলার মাঝে আলাদা একটা আনন্দ আছে। ওই সময়েই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তার সন্তানদেরও ডাক্তারী পড়াবেন। তার ছেলেমেয়েদের বাড়তি কোন চাহিদা ছিল না। তাই শত কষ্টের মাঝেও সেটা আজ সম্ভব হয়েছে।
মায়ের পাশে বসেই কথা হয় সকল ভাই বোনের ছোট ডা. ফাহরিয়া রহমান ত্রোপার সাথে। তিনি গ্রামের কাগজকে বলেন, ‘মা হয়তো আমাদের চাহিদা মতো জামাকাপড় দিতে পারেননি, ভালো খাবার দিতে পারেননি, কিন্তু ন্যায়নীতি ও চরিত্র গঠনে কোনো কমতি রাখেননি আমাদের।
এই বয়সেও আমার মায়ের জ্ঞান অর্জনের যে পিপাসা তা আমাকে খুব অবাক করে। সময়ের আবর্তনে এখনো মা তার কর্ম আর জীবন দর্শন দিয়ে আমাদের সবসময় বলেন অসুস্থ মানুষের সেবা করাই প্রকৃত ধর্ম। মা আমাদের মাঝে দায়িত্ব আর আদর্শের বীজ বুনে দিয়েছেন তাই হয়তো কখনো পথ হারা হইনি আমরা।’
মন্তব্য করুন