
যশোর জেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাস্টার ট্রেইনার আশরাফ আলীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাধারণ শিক্ষকদের জিম্মি করে অর্থ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি মোটরসাইকেলের অপব্যবহার, ভুয়া বিল ভাউচারসহ অনৈতিক ১০ দফা অভিযোগ সংক্রান্ত সংবাদটি দৈনিক গ্রামের কাগজে প্রকাশিত হলে মহা পরিচালকের দপ্তর থেকে তদন্তের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একজন সহকারী পরিচালক ইতিমধ্যে যশোরে এসে তদন্ত শুরু করেছেন। এদিকে তদন্তে স্বচ্ছতা চেয়ে অধিকাংশ শিক্ষক ও স্টাফ অভিযুক্ত আশরাফ আলীর বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। অপরদিকে অভিযোগের ব্যাপারে জোরালো তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় অভিযুক্ত আশরাফ আলী নানামুখি প্রভাব খাটিয়ে চলেছেন বলেও অভিযোগ এসেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক, প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরে দেয়া অভিযোগ ও বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য মেলে, যশোর জেলা কার্যালয়ের মাস্টার ট্রেইনার আশরাফ আলী মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকদের জিম্মি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে আসছেন প্রায় এক যুগ ধরে। বিভিন্ন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশিক্ষণ ফির নামে লুটপাট করেছেন তিনি। মণিরামপুর ও ঝিকরগাছা উপজেলায় কুরআন প্রশিক্ষণ ও মুয়াল্লিম প্রশিক্ষণ কোর্সের নামে শিক্ষকদের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়েছে। অনলাইন ক্লাস প্রতারণা করে জুম অ্যাপের মাধ্যমে কুরআন শিক্ষার কথা বলে শিক্ষকদের কাছ থেকে ২শ’ টাকা করে রেজিস্ট্রেশন ফি এবং ৩ হাজার ৫শ’ টাকা মূল্যের কুরআন লার্নিং পেন’ ও বই কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা। অফিসের সরকারি গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ব্যক্তিগত কাজ চালানো এবং ছুটির দিনে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ করে ব্যক্তিগত সফরে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভুয়া টিএ বিল করেছেন বিভিন্ন সময়ে। এর আগে সাময়িক বহিষ্কার থাকার সময়েরও ভুয়া ভ্রমণ বিল দাখিল করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। যা দপ্তর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এছাড়া শিক্ষকদের কাছে বাধ্যতামূলক কবিরাজি ওষুধ বিক্রিসহ একটি বিশেষ দলের বই বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের নিয়ে কোম্পানির ক্যাম্পেইন করছেন এমন ভিডিও ও অনেক ছবি রয়েছে। এসব অভিযোগের ব্যাপারে ইসলামি ফাউন্ডেশন যশোর জেলা অফিসের পক্ষে তদন্ত কমিটি করে তদন্তও করানো হয়েছে, আর তাতে অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান উপ পরিচালক বিল্লাল বিন কাশিম ঢাকাস্থ প্রকল্প পরিচালকের কাছে অভিযুক্ত মাস্টার ট্রেইনার আশরাফ আলীর বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা চেয়েছেন। উপ পরিচালক তার স্মারক পত্রে নানা অভিযোগের বরাত দিয়ে ১০ দফা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা চান। উপ পরিচালকের দেয়া পত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার নামে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক শিক্ষিকাদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ প্রহণ করেছেন, যা আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির শামিল। অনলাইন মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও উপকরণ প্রদানের নামে অর্থ আদায় করেছেন, যা অনুমোদিত নয় এবং সরকারি বিধি-বিধানের লঙ্ঘন। মাস্টার ট্রেইনার আশরাফ আলী প্রশিক্ষণার্থীদের উপস্থিতি, উপকরণ বিতরণ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা রক্ষা না করে অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত পদমর্যাদার অপব্যবহার করে অধীনস্থ শিক্ষক ও কর্মীদের উপর প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেন। বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনের নামে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি রাত ১২ টার পরে মাউশিক শিক্ষিকাদের কাছে মোবাইল ফোনে অশ্লীল কথাবার্তা আলাপ আলোচনা করেন। এতে ওই শিক্ষিকার পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অফিসের শৃঙ্খলা ভঙ্গ, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য এবং অসদাচরণমূলক আচরণের মাধ্যমে দাপ্তরিক পরিবেশ বিঘ্নিত করেছেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তিনি লিখিতভাবে অর্থ গ্রহণের বিষয় আংশিকভাবে স্বীকার করেছেন। তিনি সরকারি ছুটির দিনে অফিসের মোটরসাইকেল ব্যবহার করে তার ব্যক্তিগত ব্যবসা গনশিক্ষার শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের কাছে জোর করে বিভিন্ন রোগের ওষুধ বিক্রি করেন। ফলে প্রতিটি উপজেলা থেকে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা অনৈতিকভাবে আয় করছেন। এতে অফিসের ভাবমুর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। আশরাফ আলী জেলা সদরে বাড়ি হওয়ায় তিনি দাপটের সাথে অফিস করেন। নিয়মিত অফিসে আসেন না। নিজ ইচ্ছায় অফিসে আসা যাওয়া করেন। তিনি অফিসের কোনো শৃঙ্খলা মানেন না। এমনকি অফিসের সহকর্মীদের সাথে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তিনি দীর্ঘ ১২ বছর নিজ জেলায় চাকরি করছেন। ফলে কাউকে তিনি তোয়াক্কা করেন না। এদিকে এসব তথ্যে গত ৬ এপ্রিল দৈনিক গ্রামের কাগজে সংবাদ প্রকাশিত হয়। আর মহাপরিচালক তদন্তের নির্দেশনা দেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশেনের উপ পরিচলক প্রশাসন এস. এম. আনিসুর রহমানের দেয়া পত্রে তদন্তের কথা বলা হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন যশোর জেলা কার্যালয়ের মাস্টার ট্রেইনার আশরাফ আলীর বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে অর্থ গ্রহণ, মোবাইল অ্যাপ এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশক্ষণ, উপকরণ প্রদানের নামে অর্থ আদায়, পদ মর্যাদার অপব্যবহার, কেন্দ্র পরিদর্শনের নামে অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত থাকা এমনকি রাত ১২ টার পরে মোবাইলে শিক্ষিকাদের কাছে অশ্লীল কথা বার্তা আলাপ আলোচনা করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ তদন্তে প্রকল্পের সহকারী পরিচালক (কার্যক্রম ও প্রশাসন) জামাল উদ্দিনকে দায়িত্ব দেয়া হলো। এ ব্যাপারে যোগযোগ করা হলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জনসংযোগ প্রধান বিল্øাল বিন কাশেম জানিয়েছেন, হ্যাঁ, তদন্ত শুরু হয়েছে আশরাফ আলীর বিরুদ্ধে। ইতমধ্যে সহকারী পরিচালক জামাল উদ্দিন যশোরে গেছেন এবং কার্যক্রম শুরু করেছেন। দ্রুতই প্রতিবেদন জমা হয়ে যাবে। এদিকে, যশোর অফিস থেকে জানানো হয়েছে মাস্টার ট্র্নেইনার আশরাফ আলীর বিরুদ্ধে অনেকগুলো অভিযোগ এসেছিল। প্রাথমিক তদন্তে এসবের সত্যতা মিলেছে। আশরাফ আলীর বিরুদ্ধে আসা অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের কাছে জানোনো হয়। এর আগেও তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারেও নির্দেশনা চাওয়া হয়।
মন্তব্য করুন