মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
উত্থান-পতনের গল্প হার মানায় সিনেমাকেও

যশোরের মাঠ কাঁপানো ফুটবলার থেকে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের’ শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন

কাগজ সংবাদ
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ১২:১৩ এএম
আন্ডারওয়ার্ল্ডের’ শীর্ষ সন্ত্রাসী নাইম আহমেদ টিটন

রাজধানীতে গুলিতে নিহত ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের’ শীর্ষ সন্ত্রাসী নাইম আহমেদ টিটনের দাফন যশোরে সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার রাতে যশোর কারবালা কবরস্থানে পিতা ও বড়ভাইয়ের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এর আগে রাত ৮টার দিকে তার মরদেহ ঢাকা থেকে যশোরের খড়কি এলাকার বাড়িতে আনা হয়। এসময় স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

এর আগে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার পাশে প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন টিটন। ঘটনাটি ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে, যেখানে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাকে এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে। যশোরের জনপ্রিয় ফুটবলার থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী বনে যাওয়া টিটনকে নিয়ে এখন আলোচনা চলছে গোটা জেলাজুড়ে।

টিটনের পৈত্রিক বাড়ি যশোর শহরের খড়কি এলাকায়, স্থানীয়ভাবে ‘আপন মোড়’ নামে পরিচিত স্থানে। টিটনের বাবা ফখরুদ্দিন খুলনার একটি জুটমিলের কর্মকর্তা ছিলেন। পরিবারে দুই মা, সাত ভাই ও পাঁচ বোন। টিটন অল্প বয়সেই অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন। তার ভাই টুটুলও একই পথে হাঁটেন। স্থানীয়দের দাবি, তাদের অপরাধজগতে প্রবেশের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমনের, যিনি টিটনের ভগ্নিপতি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময়ে জনপ্রিয় ফুটবলার ছিলেন খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে যশোরের ওস্তাদখ্যাত কোচ ইমদাদুল হক সাচ্চুর তত্ত্বাবধানে জেলায় যে কয়েকজন ফুটবলার প্রতিনিধিত্ব করতেন টিটন তাদের একজন। আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় নৈপুণ্যতা থাকায় চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, ঢাকাতেও বিভিন্ন দলের হয়ে খেলতেন। খেলোয়াড় জীবনের জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকাকালীন জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। পদ পদবীতে না থাকলেও বিএনপির স্থানীয় কর্মী ছিলেন টিটন। ৯৮ সালের দিকে যশোরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রতিপক্ষরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। কয়েকমাস জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পরে সুস্থ হয়ে জড়িয়ে পড়েন অপরাধজগতে। ১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালা এলাকায় মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিএনপি কর্মী মোসলেম উদ্দিন খোকন ও টিপুকে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়। এই জোড়া হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালায় ওই জোড়া খুনের পর যশোর ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। পরে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে অপরাধজগতে নিজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন। তিনি একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বও দেন। অস্ত্র-সোনাচালান ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তার নেতৃত্বে অস্ত্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা। ২০০৪ সালে টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট জামিনে মুক্তির পর তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে। অপর একটি সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর যে ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে টিটনের নাম ছিল ২ নম্বরে। সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে এই শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে দেশজুড়ে পোস্টার সাঁটা হয়। টিটনের ভগ্নীপতি ছিলেন ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমন, যার ছত্রছায়ায় টিটন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। টিটনের নাম মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসী চক্র হারিছ-জোসেফ গ্রুপে যুক্ত ছিলো। টিটনের তৎপরতা ছিল ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায়।

যশোরের সাবেক খেলোয়াড় ও রেফারি লাবু জোয়াদ্দার জানান, ‘টিটনের বাবা দুটি বিয়ে করেন। দুই মায়ের ১২ সন্তানের মধ্যে টিটন প্রথম মায়ের সন্তান। ৯০ দশকের দিকে নাইম আহমেদ টিটন ও তার বড় ভাই রিপন দুজনেই যশোরের সেরা ফুটবলার ছিলেন। সাচ্চু ওস্তাদের নেতৃত্বে আমরা যারা ৯০ দশকে এই অঞ্চলে ফুটবলের নেতৃত্ব দিতাম; তাদের মধ্যে টিটন একজন। দুঃখজনক ঘটনা হলো নামকরা ফুটবলার থেকে সে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে। তার এই জগতে প্রবেশেও ট্র্যাজেডি রয়েছে। তার উপর রাজনৈতিক হামলা হওয়াতে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে সে ওই জগতে পা বাড়ায়। ৯৯ সালের দিকে ঢাকায় গিয়ে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে সে আর যশোরে আসেনি।’

স্থানীয়রা আরও জানান, দীর্ঘদিন যশোরে না থাকায় এই প্রজন্মের অনেকেই টিটনকে চিনেন না। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিন থেকে চারবার যশোরের বাড়িতে আসেন। যদিও তিনি অবিবাহিত। বাড়িতে এসেও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না। পরিবারের স্বজনরা টিটনের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি গণমাধ্যমের কাছে।

দীর্ঘ কয়েক দশকের অপরাধ অধ্যায়ের পর অবশেষে গুলিতেই এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর জীবনের সমাপ্তি ঘটলো। এদিকে, এই ঘটনার বুধবার সকালে ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকায় মামলা করেন বড়ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন। এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এদিকে, হত্যাকান্ডের শিকার টিটনের মরদেহ বুধবার রাতে তার বড় ভাই রিপন ঢাকা থেকে যশোরের বাড়িতে নিয়ে আসেন। এশা বাদ জানাযার নামাজ শেষে রাতে শহরের কারবার কবরস্থানে দাফন করা হয়।

যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি মাসুম খান জানান, টিটনের যশোরে বাড়ি থাকার তথ্য তারা শুনেছেন। তবে তিনি নতুন দায়িত্ব নেওয়ায় বিস্তারিত তথ্য জানা নেই।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কেশবপুরে ভূমি সহকারীর বাড়িতে অজ্ঞান পার্টির হানা

একনেক সভায় ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব

পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে আনুশকার অস্বস্তি!

মণিরামপুরে নাতনীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক-১

তথ্য উপদেষ্টা / স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, থাকবে না দলীয় প্রতীক

যশোরসহ ২০ অঞ্চলে ঝড়ের সম্ভাবনা

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

কেশবপুরে শরীকানা পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

পাবনায় হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, নিহত ৩

রাজশাহীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়লো স্বর্ণের দাম

ফের বাড়ল তেলের দাম

বিশ্বকাপ ইতিহাসে পেনাল্টি গোলের রেকর্ডে লিওনেল মেসি

দেশে ফিরলেন ৪৫১৫৮ হাজি, মৃত্যু ৪৯

নওগাঁয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ সুপারের সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা

X