
# স্যানিটেশন প্রকল্পের নামে সেরেফ ভাওতাবাজি # টাকা নেয়ার দায়িত্বে থাকা মাঠকর্মীরা বিপাকে # ভাঙানো হয়েছে ব্র্যাকের আবাসন প্রকল্পের নাম # পালিয়ে বেড়াচ্ছে প্রধান অভিযুক্ত শফিক- মুরাদ
যশোর সদরসহ ৪টি উপজেলায় অনুমোদনহীন রোকেয়া জামান যুব কল্যাণ সংস্থার নামে অস্থায়ী অফিস খুলে বৃহত্তর যশোর ও খুলনাঞ্চল জুড়ে নানামুখি প্রতারণামূলক কার্যক্রম চালিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। ভাল বেতনে চাকরি দেয়ার নামে পরিচয়পত্র দিয়ে শতাধিক নারী কর্মীকে মাঠে নামিয়ে ৫ সহস্রাধিক মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৪ কোটি টাকা। ঋণ দেয়া, গভীর নলকুপ বসানো, পাকা বাথরুম করে দেয়া, টিসিবি, সোলার বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সুবিধা দেয়ার নামে এই টাকা নিয়ে ‘পালেরগোদা’ মণিরামপুরের সরুদহের শফিকুজ্জামান ও ব্র্যাকের বড় কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী মুরাদ হোসেন গা ঢাকা দিয়েছে।
এদিকে মানুষের কাছ থেকে নানা সুবিধা দেয়ার নামে টাকা আদায় করা শতাধিক নারী মাঠকর্মী পড়েছেন মহাবিপাকে। পাবলিকের চাপের মুখে মাঠকর্মীরা সম্প্রতি অফিসগুলোতে গিয়ে দেখেন তালা ঝুলছে। প্রধান অভিযুক্ত শফিকুজ্জামান কিংবা মুরাদদের কাউকে পাচ্ছেন না তারা। এ ঘটনায় ২৮ এপ্রিল শতাধিক লগ্নিকারীকে সাথে নিয়ে ৩৫ জন মাঠকর্মী আসেন প্রেসক্লাব যশোরে। করেন সংবাদ সম্মেলন। তুলে ধরেন তাদের বর্তমান পরিস্থিতি ও অভিযুক্ত শফিকুজ্জামান ও মুরাদের প্রতারণার নানা তথ্য। তথ্য মিলেছে, মণিরামপুরের সরুপদহ এলাকার বহু বিতর্কিত শফিকুজ্জামান বছর দেড়েক আগে রোকেয়া জামান যুব কল্যাণ সংস্থা নামে অনমোদনহীন নামকাওয়াস্তে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা শুরু করেন। যশোরের বলাডাঙ্গা কাজীপুরে সন্নাসী বটতলা এলাকায় একটি, ঝিকরগাছা কলেজ মোড়ে একটি, অভয়নগর পায়রাডাঙ্গায় একটি এবং মণিরামপুরে অফিস খুলে বসেন নিয়োগ প্রতারণা ও পাবলিকের টাকা হাতানো কারসাজির জন্য। ভুইফোঁড় এই প্রতিষ্ঠান খুলে চাকরি দেয়ার নামে প্রথমে শতাধিক নারীর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে ফিতাযুক্ত পরিচয়পত্র ধরিয়ে দেন। তাদের ১৫ হাজার টাকা করে বেতন দেয়া হবে বলে প্রলোভন দেয়া হয়। ওই শফিক ও মুরাদ চক্রের প্রলোভনে পড়ে অভয়নগর ও মণিরামপুর এলাকার বেকার নারীরা যুক্ত হন। যোগ দেন পুরুষ কর্মীও।
তথ্য মিলেছে, ওই নারীদের মাঠে নামিয়ে প্রচার করা হয় ঋণ দেয়া, অল্প খরচে গভীর নলকুপ বসানো, পাকা বাথরুম করে দেয়া, টিসিবি সুবিধা, সোলার বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হবে প্রচার চলে। এরপর মাথাপ্রতি ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতানো শুরু করেন শফিকুজ্জামান ও মুরাদের প্রতারণার শিকার নানী মাঠকর্মীরা। বৃহত্তর যশোরের ৪ জেলাসহ খুলনা বিভাগের ১০ জেলা জুড়ে নেটওয়ার্ক তৈরি করে। এভাবে ৫ হাজার মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতানো হয়েছে।
তথ্যানুযায়ী, মাঠকর্মী লিমা খাতুনের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা, স্বপ্না সুলতানার কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা, সালমা বেগমের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা, বাবলুর রহমানের কাছ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, বেবি খাতুনের কাছ থেকে ১০ লাখ ঢাকা, ইতি খাতুনের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা, ফাতেমা বেগমের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা, আয়েশা আক্তারের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা, সাফিয়া বেগমের কাছ থেকে ১৪ লাখ টাকা, সাধনা সরকারের কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা, লাভলী বেগমের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা, আফরোজা আক্তার পলির কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা, ইমন হোসেনের কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা, সালমা বেগমের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওই শফিকুজ্জামান ও মুরাদ গং। এছাড়া অনেকের কাছ থেকে আরো কোটি টাকার মত টাকা হাতিয়েছে। লোন দেয়ার কথা বলে বেবি, ইতি ও ছালমাদের নিকট থেকে ইসলামী ব্যাংকের দু’টি করে স্বাক্ষরিতে চেকের পাতাও গত দেড় বছর আগে গ্রহণ করেন শফিকুজ্জামান।
ভুক্তভোগীদের পক্ষে ঝিকরগাছার পুরন্দরপুরের স্বপ্না সুলতানা জানান, খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় স্বাস্থ্য স্যানিটেশন ও আবাসন প্রকল্প (প্রণদনা ব্র্যাক) নামে হত দরিদ্র পরিবারকে ঘর, টিউবওয়েল, সৌর বিদ্যুৎ, সেলাই মেশিন, বাথরুম ঘর, স্বল্প মূল্যে নিত্যপন্য দেয়ার কথা বলে সংস্থার সভাপতি নামধারী স্বরূপদহের শফিকুজ্জামান ও দুর্গাপুরের মুরাদ। এছাড়া তাদের সহযোগী হিসেবে ঢাকুরিয়ার নাজমা খাতুন প্রতারণার কাজে লিপ্ত ছিল। তারা যোগসাজসে ৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।
অপর ভুক্তভোগী লিমা আক্তার জানান, শফিকুজ্জামান চক্র হাতিয়ে নেয়া টাকায় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে টাকাগুলো আত্মসাৎ করেছে। এছাড়া স্বল্পমূল্যে দ্রব্য ক্রয়ের কথা বলে তাদের কাছ থেকে ১০ হাজার কার্ড দেয়ার নামে আরো ৩০ লাখ টাকা নিয়েছে। সেভ দ্যা সিলড্রেন ডাচ বাংলা ব্যাকের এ্যাকাউন্ট বাবদ মাথা প্রতি ৬শ’৫০ করে ২ দুই হাজার একাউন্টের মাধ্যমে আরো ১৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে ওই শফিকুজ্জামান মুরাদ গং। এভাবে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে আত্মসাৎ করে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অফিসগুলোও বন্ধ। পাবলিক মাঠ কর্মীদের ধাওয়া করেছে। মাঠকর্মীরা নিজের জমি গরু ও বাড়ি ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে পাবলিকের টাকা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
লগ্নিকারীরা জানিয়েছেন. টাকা ফেরত চাইলে শফিকুজ্জামান ও মুরাদ তাদের উল্টো ভয়ভীতি ও চেকের মিথ্যা মামলার হুমকি দিচ্ছেন। বর্তমানে মাঠকর্মী ও অনেক গ্রাহক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অর্ধশত লগ্নিকারী ও ৩০ জন মাঠকর্মী জানান, শফিকুজ্জমান-মুরাদের বিচার হওয়া জরুরি। দ্রুত শফিকুজ্জামান ও মুরাদকে আটক করে আইনের আওতায় আনার দাবিও তাদের।
এ ব্যাপারে প্রধান অভিযুক্ত শফিকুজ্জামানের সাথে কথা বললে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, তার সম্মান নষ্ট করা হচ্ছে অভিযোগ তুলে। তিনি কোনো টাকা আত্মসাৎ করেননি। করলে করেছে ব্র্যাকের পরিচয় দিয়ে তার সাথে যুক্ত হওয়া মুরাদ। তিনি মুরাদের কাছে ওই প্রকল্প হস্তান্তর করে দিয়েছেন। কাজেই এখন তার কোনো দ্বায় নেই। এদিকে মুরাদের সাথে কথা বলতে ফোন দেয়া হলে তা বন্ধ পাওয়া গেছে।
মন্তব্য করুন