
যশোরের কেশবপুর-কলাগাছি-কুমারঘাটা সড়ক সংস্কার কাজ ধীরগতিতে চলায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চারটি ইউনিয়নের প্রায় ৪০টি গ্রামের বাসিন্দারা। দুই বছরেরও বেশী চলমান এই প্রকল্পে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে পথচারীদের মধ্যে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কেশবপুর-কুমারঘাটা ভায়া কলাগাছি সড়ক সড়ক দিয়ে উপজেলার সদর, পাঁজিয়া, সুফলাকাটি ও গৌরীঘোনা ইউনিয়নের প্রায় ৪০টি গ্রামের মানুষ প্রশাসনিক, চিকিৎসা, কেনাবেচা বা নাণিজ্যিক কাজে কেশবপুর শহরে যাতায়াত কওে থাকেন। এ ছাড়া অন্যান্য এলাকার মানুষ পাঁজিয়া ও কলাগাছি হয়ে মনিরামপুরের কালিবাড়ি, নেহালপুর ও নওয়াপাড়ায় যাতায়াত করে থাকেন। অতি জনগুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি ভেঙ্গেচুরে দীর্ঘদিন চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে পথচারীরা সড়কটি সংস্কারের দাবি করে আসছেন।
উপজেলা প্রকৌশলী অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৪.৫ কিলোমিটার ওই সড়ক সংস্কারের জন্য এলজিআরডি অধিদপ্তরের আরসিআইপি প্রকল্পের অধীনে ২০ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে দরপত্রের মাধ্যমে কার্পেটিং ও আরসিসি ঢালাই কাজ পায় গোপালগঞ্জের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স কামরুল এন্ড ব্রাদার্স’। তবে বাস্তবে কাজটি করছেন মনিরামপুরের আব্দুল খালেক ওরফে ভাটা খালেক নামে এক ঠিকাদার, যার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স দিগন্ত এন্টারপ্রাইজ’। স্থানীয়দের অভিযোগ, এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা, যন্ত্রপাতি ও জনবল না থাকলেও তিনি কাজটি কিনে নিয়ে বাস্তবায়ন করছেন।
২০২৪ সালের ১০ মার্চ কাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। পরে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে সড়কের কাজ চলমান থাকায় এলাকাবাসীকে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এক কিলোমিটার পথ যেতে ঘুরে যেতে হচ্ছে ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার। ফলে শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সড়কের পাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ টুক টুক করে রাস্তার কাজের কারণে আমাদের চলাচল জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত জনবল ও যন্ত্রপাতি না থাকায় অল্প অল্প সেকশন করে গত দুই বছর ধরে কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে নিজের ইটভাটার অবিক্রীত ও নিম্নমানের ইট রাস্তার কাজে ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
সরেজমিনে জানা যায়, ওই সড়কে পৌর এলাকার খতিয়াখালি রিশিপাড়ার পাশে দুই জায়গায় ৫-৬ শ’ ফুট দৈর্ঘ বক্স কেটে রাখা হয়েছে । স্থানীয় বাসিন্দা দীপু দাস জানান বালির ব্যবস্থা না করেই রাস্তা জুড়ে বক্স কাটা হয়েছে। বুধবারের বৃষ্টিতে পানি জমে যাওয়ায় ৬-৭ কি.মি. ঘুরে মাগুরাডাঙ্গা হয়ে যানবাহন চলাচল করছে। এ অবস্থায় পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক নারী বাচ্চাসহ উচু মাটির ওপর থেকে পড়ে আহত হয়েছে।
পাঁজিয়া ইউনিয়নের বেলকাটি গ্রামের শারিরীক প্রতিবন্ধী রায়হান হোসেন বলেন, ‘সপ্তাহে চার দিন সাইকেল চালিয়ে ৭ কিলো পথ পাঁড়ি দিয়ে কেশবপুর শহরে যেতে হয় কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই সড়ক সংস্কার কাজ খুবই ধীর গতির কারণে পড়তে হচ্ছে দুর্ভোগে। রাস্তায় এক সপ্তাহ কাজ হলে পরের দুই সপ্তাহ কাজ হয়না’।
কাজ বাস্তবায়নকারী ঠিকাদার মেসার্স দিগন্ত এন্টারপ্রাইজের আব্দুল খালেক গ্রামের কাগজকে বলেন, ‘কামরুল এন্ড ব্রাদার্স আমার ভাইয়ের, আমরা একসাথে ব্যবসা করি। জ্বালানী ও বালি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে কাজটি সম্পন্ন করতে দেরি হচ্ছে। এতে মানুষের একটু দুর্ভোগ হচ্ছে ঠিকই তবে আমরা কাজটি দ্রুত শেষ করার জন্য চেষ্টা করছি। নিম্নমানের ইটের বিষয়ে তিনি জানান, আমার ভাটার কোন ইট খারাপ না।’
উপজেলা প্রকৌশলী এম. এ জাসির ঠিকাদারের কাজে বিরক্তি প্রকাশ করে গ্রামের কাগজকে বলেন, ‘সাড়ে তিনমাস আগে আমি এই উপজেলায় যোগদানের পর যা বুঝেছি, এই ঠিকাদার কারো কথা শোনে না, নিজের খেয়াল খুশীমত কাজ করেন। যেহেতু কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, তাই ঠিকাদারকে একটা চিঠি ধরিয়ে দেওয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই।’
সচেতন মহলের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির সংস্কার কাজ দ্রুত ও মানসম্মতভাবে শেষ করতে কঠোর নজরদারি জরুরি। অন্যথায় জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
মন্তব্য করুন