
যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্পের কার্যক্রমে চরম অনিয়ম ও দুনীতির অভিযোগ উঠেছে। শুধুমাত্র কর্মকর্তাদের লাগামহীন অনিয়ম ও পরিকল্পনার অভাবের দিন দিন বাড়ছে জনভোগান্তি। স্থানীয়দের অভিযোগ জনস্বার্থে প্রকল্প গুলো অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে টিউবওয়েলসহ বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী জয়দেব দত্তের দপ্তরে প্রায় প্রতিদিনই টিউবওয়েল পাওয়ার আশায় আসছেন বহু মানুষ। তাদের অভিযোগ করছেন, তিন-চার বছর আগে সরকারী নিয়মে ১০ হাজার টাকা পরিবর্তে ১৭ হাজার টাকা জমা দিলেও এখনো তারা টিউবওয়েল পাননি। দপ্তরে এসে তারা কর্মকর্তার কাছে জানতে চান টাকা দিয়েছি। টিউবওয়েল কবে পাবো? কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো উত্তর প্রকৌশলী জয়দেব দত্তের কাছ থেকে পাচ্ছেন না এমন অভিযোগ ভুক্তভোগিদের।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে গভীর ও সাবমার্সিবল নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪৪২টি। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৫৯৫টি এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২০৪টিতে। এছাড়াও ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে কমিউনিটি পানির প্লান্ট ১৩৬টি। কমিউনিটি টয়লেট ৩৪টি এবং গ্রামভিত্তিক আধুনিক টয়লেট প্রকল্পের আওতায় ৮৮৪টি টয়লেট বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পাঠানো বাস্তবায়ন প্রতিবেদনে এসব প্রকল্প শতভাগ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সুবিধাভোগী এখনো তাদের প্রাপ্য সুবিধা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র মতে,সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর দপ্তরে প্রায় ৬৪৮টি টিউবওয়েলের একটি তালিকা রয়েছে। এ তালিকার ভিত্তিতে আবেদন নেওয়া হলেও যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এতে নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কারণ ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের বরাদ্দ যেখানে মাত্র ২০৪টি। সেখানে ৬৪৮টি নামের তালিকা কিভাবে তৈরি হলো তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন? এমনকি তার একই স্টেশনে প্রায় ১০ বছর কর্মরত থাকার খুটির জোর নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
অপরদিকে, মণিরামপুর পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি সরবরাহ স্যানিটেশন ও পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রকল্পের সুফল তারা প্রত্যাশিত ভাবে পাচ্ছেন না। পানি সরবরাহ চালু হলেও পানির মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ফলে অনেক জায়গায় ময়লা-আবর্জনা দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে ডায়রিয়া ও ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের আশঙ্কা বাড়ছে।
এ বিষয়ে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিশাত তামান্না সাংবাদিকদের বলে ছিলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকল্প নিয়ে যে অভিযোগ গুলো উঠেছে তা গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তার বদলির পর সেই তদন্তের অগ্রগতি নেই। ফলে বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে।
এ সব বিষয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৈৗশলী জয়দেব কুমার দত্তের দাবী, ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হয়ে পড়ে। আগে যে তালিকা পাওয়া গিয়ে ছিল। বর্তমানে যে তালিকা রয়েছে দুটির মধ্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ফলে যারা আগে টাকা জমা দিয়েছেন তারা যেমন ভোগান্তিতে পড়েছেন। তেমনি নতুন করে যারা আবেদন করতে চান তাদের কাছ থেকেও এখন টাকা নেওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রশাসনিক নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন বলেও তিনি দাবী করেন। এছাড়াও তিনি পূর্বের ভুক্তভোগিদের টাকা ফেরত দেয়ার দাবী করে বলেন, কারও কোন অভিযোগ থাকলে নাম বলেন এবং তাদের অফিসে আসতে বলেন।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেনের হোয়াসঅ্যাপে কল করা হলে তিনি বলেন, যেহেতু আমি এখানে নতুন আসছি, বিষয় গুলো আমি ভালো জানি না। আমি খোজ-খবর নিয়ে পরে জানাতে পারবো।
স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাড, গাজী এনামুল হক বলেন, জনস্বাস্থ্য সরাসরি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে জড়িত। তাই টিউবওয়েল বরাদ্দ ও জনস্বাস্থ্য প্রকল্পে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা দ্রুত সমাধান করা জরুরি।
সচেতন মহলের মতে, জনস্বাস্থ্য খাতের প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রকাশ করা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। অন্যথায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে এবং প্রশাসনের প্রতি আস্থার সংকট বাড়াবে।
মন্তব্য করুন