
আজ ৪ এপ্রিল যশোরের ইতিহাসে ভয়াবহ গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে যশোর সেনানিবাস থেকে রক্ত পিপাসু পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী শহরে এসে মসজিদ, মাদ্রাসা, গীর্জা, হাসপাতাল, থানাসহ বাড়িতে বাড়িতে হামলা চালিয়ে নির্বিচারে অন্তত ১০০জন নিরীহ বাঙালীকে হত্যা করে। তবে, নিহতের সংখ্যা নিয়ে গবেষকরা বলেন, সেদিন কয়েকশ’ নিরীহ বাঙালী প্রাণ হারিয়েছিলেন, যার পুরো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। এরও আগে ২৮ মার্চ বেজপাড়ায় সমাজ সেবক ও ক্রীড়া সংগঠক শহীদ সুধীর ঘোষ, তাঁর ছেলে সত্যব্রত ঘোষ, নিকটজন নারায়ণ চন্দ্র দাসসহ ওই এলাকা থেকে অসংখ্য মানুষকে বাড়ি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় বর্বর হানাদার বাহিনী। তাদের আর ফিরে পাওয়া যায়নি। নির্বিচার গুলি করেও হত্যা করে অনেককে। যে তালিকা অনেক দীর্ঘ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভয়াল কালোরাতের পর থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত তৎকালীন বাঙালী ইপিআর ও পুলিশ সদস্য এবং ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে আসছিলেন। এর মাঝেও প্রতিরোধ যুদ্ধে আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের সদস্যরা যেমন প্রাণ হারাচ্ছিলেন, তেমনি পাকিস্তানী সেনা এবং অবাঙালীদের আকস্মিক হামলায় শহরের বেজপাড়া, রেলগেট, মুড়লি প্রভৃতি এলাকায় প্রাণ হারাচ্ছিলেন নিরীহ মানুষ। তবে ৪ এপ্রিল ব্যাপক গণহত্যা চালানোর মধ্যদিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সে প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধ গুড়িয়ে দেয়। একাত্তরের আজকের দিনে যশোর রেলস্টেশন মাদ্রাসায় হানাদার বাহিনী কোরান শরীফ অধ্যায়নরত মুসল্লিদের ওপর গুলি চালিয়ে ২৩ জনকে হত্যা করে। শহীদদের মধ্যে দাদা, বাবা, ছেলে তিন প্রজন্মসহ একই পরিবারের ৮ সদস্যও ছিলেন।
আজো বেঁচে থাকা সে সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী যশোর ইনস্টিটিউটের কর্মচারী শেখ আব্দুর রহিম ও জিয়াদ আলী খান বলেন, সেদিন ছিলো এক ভয়ঙ্কর দিন। সেদিন সকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী মাদ্রাসায় ঢোকার মুখে তাদের সাথে সুপার আবুল হাসান যশোরী কথা বলেন। তিনি আরবী, উর্দু, ফারসি প্রভৃতি ভাষায় তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, এটি একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ সময় মাদ্রাসা শিক্ষক ‘কাঠি হুজুর’ খ্যাত মাওলানা হাবিবুর রহমান এগিয়ে আসেন। হানাদাররা শুরুতে ওই শিক্ষকের বুকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। এরপর হত্যা করা হয় দাদা তাহেরউদ্দিন, বাবা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ, ছেলে বরিশাল মেডিকেলের ছাত্র কামরুজ্জামানকে। আরো হত্যা করা হয় বাবা শিক্ষা কর্মকর্তা কাজী আব্দুল গণি, ছেলে কাজী কামরুজ্জামান, ভাই দীন মোহাম্মাদ, ভাই শিক্ষক আয়ুব হোসেন, যশোর জিলা স্কুলের শিক্ষক সাহিত্যিক আব্দুর রউফ, মাদ্রাসা ছাত্র আতিয়ার রহমান, নওয়াব আলী, লিয়াকত আলী, আক্তার হোসেন, যশোর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলার হাজী আনিছুর রহমান মুকুলের দাদা আমজেদ আলীকে। এ ছাড়া কয়েকজনের নাম পরিচয় পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে এই ২৩ শহীদকে একই সঙ্গে মাদ্রাসার সামনে একটি কবর খুঁড়ে সমাহিত করা হয়।
পাকিস্তানি বাহিনী ফেরার পথে ষষ্টীতলা পাড়ায় হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক, সাবেক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রহমত উল্লাহ এবং তার দুই ছেলে মোহাম্মদ আলী ও মোসাদ্দেক রহমত উল্লাহকে। ষষ্টিতলা পাড়ায় এদিন আরও নিহত হয়েছিলেন এডভোকেট সৈয়দ আমীর আলীসহ আরও কয়েকজন। ক্যাথলিক গির্জায় হত্যা করা হয় ফাদার মারিও ভেরনেসি, স্বপন পল বিশ্বাস, প্রকাশ বিশ্বাস, অনিল সরদার, পবিত্র বিশ্বাস, ফুল কুমারী তরফদার, মাগদালিনা তরফদার ও আঞ্জেলা বিশ্বাসকে। যাদের সমাধী আজও ক্যাথলিক গির্জা প্রাঙ্গণে কালের স্বাক্ষী হয়ে রয়েছে।
সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায়, ফাতিমা হাসপাতালে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার তদারকের দায়িত্ব পালন করতেন ইটালির ফাদার মারিও। এখানে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ ভয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বিকাল ৪টার দিকে হানাদাররা গালি দিতে দিতে চার্চে প্রবেশ করে ঐ হত্যাযজ্ঞ চালায়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশন যশোর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত বিশ্বাস বলেছিলেন, ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল ছিলো পাম সানডে বা তালপত্র রোববার। সেদিন প্রার্থণা করতে আসা নিরীহ মানুষ পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে অকাতরে প্রাণ হারান। কিন্তু তাদের অধিকাংশ আজও শহীদের মর্যাদা পাননি।
একই দিন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী কোতোয়ালী থানায়ও হামলা চালায়। থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যরা সেকেলে থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে হামলা প্রতিরোধ করেন। হানাদার বাহিনীর সঙ্গে পুলিশ সদস্যরা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই করে যান। এই যুদ্ধে শহীদ হন থানায় কর্মরত কনস্টেবল আব্দুস সালাম খন্দকার, আকরামুজ্জামান, নরেন্দ্র নাথ, আব্দুল হাকিম ও নায়েক আব্দুস সালাম। এদেরকে পরবর্তীতে থানা চত্ত্বরে সমাহিত করা হয়।
হানাদার বাহিনী একই দিনে তৎকালীন যশোর জেনারেল হাসপাতালে ঢুকে হাসপাতালে কর্মরত চারজন সেবিকাসহ ১১ জনকে হত্যা করে। এরা হচ্ছেন সিরাজুল ইসলাম, সাখাওয়াত হোসেন, শাহ আলম ও চাঁন মিয়া। বাকিদের নাম পরিচয় জানা যায়নি। হাসপাতালের নার্সিং ইন্সটিটিউটের দক্ষিণ পাশে এই শহীদদের গণকবর দেয়া হয়।
থানা, হাসপাতাল, মাদ্রাসা, গীর্জার এই সব নৃশংস হত্যাকান্ডের পাশাপাশি ২৭ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত হানাদার বাহিনী শহরের পাড়া মহল্লায় হামলা চালায়। তাদের হামলায় সেদিন নাট্যাভিনেতা অমল কৃষ্ণ, ডাক্তার নাসিরুদ্দিন খান, আনসার অ্যাডজুট্যান্ট আবুল হোসেন, শেখ আইন উদ্দিন, রশিদা খাতুন, আব্দুর রহমান, লুৎফর রহমান, আমিনুল ইসলাম, মাহাবুব, অরুন কৃষ্ণ সোম, নীল রতন ধর রোডের মদন সাহা, বলয় সাহা, নিমাই সাহা, এডভোকেট সুশীল রায়, বেজপাড়ায় আনসার অ্যাডজুট্যান্ট আতিয়ার রহমান, মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক, মনীন্দ্র নাথ, অমর কুমার, মাধব কুমার, কার্তিক চন্দ্র, ঋষিকেশ, গফুর শিকদার, মকবুল হোসেন, আব্দুল ওহাব, ২৮ মার্চ রবীন্দ্রনাথ সড়কে সুধীর কুমার ঘোষ ও তাঁর ছেলে সত্যব্রত ঘোষ, নারায়ণ দাস, ৪ এপ্রিল পোস্ট অফিস পাড়ার এডভোকেট সৈয়দ আমীর আলী ও তার তিন ছেলে যশোর এমএম কলেজের ছাত্র নুরুল ইসলাম বকুল, আজিজুল হক মুকুল, শফিকুর রহমান জাহাঙ্গীর, সেরেস্তাদার আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, লুৎফর রহমান, জোবেদা খাতুন, পলিটেকনিক কলেজের অধ্যক্ষ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ, ডাক্তার ওবায়দুল হক, বারান্দীপাড়ার বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুল জব্বার, আব্দুল লতিফ, আব্দুল আজিজ, সাদেক পাটোয়ারী, আব্দুল গণি, আব্দুল কাদের, মোজাম্মেল হক, তোফাজ্জেল হোসেন, আজিজুল হক, নেজামূল হক, কেতাব আলী, আজব আলী, শামসুদ্দিন, নজরুল ইসলাম, ওয়াজেদ আলীসহ ১৬ জন, হরিণাথ দত্ত লেনের সুধন্য কুমার, জামাল উদ্দিন, মান্নান, আতিয়ার রহমান, প্রভাষ চন্দ্র বোস, চাঁচড়া রাজবাড়ির পেয়ারা বেগম, জাহাঙ্গীর আলম, ফাতেমা, ফিরোজা বেগম, খুকু, বেবী, চাঁচড়া রেলগেট রায়পাড়ার রহমত আলী, রবিউল আজিজ, আশরাফ সরদার, শওকত আলী, কাজী আম্বিয়া, ঘোপের আব্দুল ওহাব, ডা. সাখাওয়াত হোসেন, উপশহর এলাকার আতিক উল্লাহ, মমিন উল্লাহসহ অসংখ্য মানুষ সেদিন শহীদ হন। যদিও সে গণহত্যার শিকার অনেকেই আজও শহীদের তালিকায় ঠাঁই পাননি।
এদিকে, শহীদ পরিবারের সন্তান সাবেক সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুর রহমান খান ইতিপূবে জানিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর এতো বছর পার হলেও তালিকায় নাম ওঠেনি যশোরের এক শহীদ পরিবারের। এই পরিবারের দু’জন সদস্য দেশ মাতৃকার টানে আত্মাহুতি দিলেও শহীদের তালিকায় তাদের নাম নেই। আর এ জন্যে শহীদ ডাক্তার নাছির উদ্দিন-রশিদা খাতুন দম্পতির সন্তানদের আফসোসের শেষ নেই।
এদিন সকাল ৮ টায় পাকিস্তানি বাহিনী রেলগেট মাদ্রাসায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে শহরের দিকে মর্টার শেলিং করতে করতে অগ্রসর হতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে বাঙ্কারে থাকা চারজন ইপিআর সদস্যের তিনজন দৌঁড়ে পালান। আরেকজন একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে ডাক্তার নাছির উদ্দিনের ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেন। ডাক্তার নাছির উদ্দিনের বাড়ির ছাদে সেসময় বাংলাদেশের পতাকা উড়ছিল। পাকিস্তানি বাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেলে। দরজা ভেঙে তারা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে মর্টার শেলিং দিয়ে অনবরত গোলা বর্ষণ করতে থাকে। এই গোলার আঘাতে প্রথমে শহীদ হন ইপিআরের সেই সদস্য। এরপর গোলার আঘাতে রশিদা খাতুন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তখনও ডাক্তার নাছির উদ্দিন জীবিত ছিলেন। হানাদার বাহিনী তার বুকে তিন রাউন্ড গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। ওই সময় তিনটি লাশের মাঝখানে উপুড় হয়ে শুয়ে ছিলেন শহীদ নাছির উদ্দিনের ছেলে আব্দুর রহমান। পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা মারা গেছে ভেবে আব্দুর রহমানের পায়ে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করে। ওই দলে থাকা আরেক সদস্য তার শরীরে গুলি করতে উদ্ধত হয়। ওই সময় হানাদারদের অফিসার পর্যায়ের একব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করে ঊর্দুতে গুলি করতে নিষেধ করে। ফলে অল্পের জন্যে প্রাণে বেঁচে যান আব্দুর রহমান। বাড়ির মধ্যে তিনজন শহীদকে মাটি চাপা দেয়া হয়। সেই গণকবরটি আজো মাথা ঊঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আজ সেই ভয়াল ৪ এপ্রিলের গণহত্যা দিবস। দিবসটি স্মরণে গণহত্যা দিবস পালন কমিটি আজ সকাল ৯টায় যশোরের শংকরপুরে বধ্যভূমিতে পূষ্পমাল্য অর্পণ ও বিকেল চারটায় টাউন হল মাঠে রওশন আলী মঞ্চে স্মরণসভা করবে।
মন্তব্য করুন