
চৈত্রের পড়ন্ত বিকেল। সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়ছে যশোরের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের সুউচ্চ ১৬ তলা ভবনের কাঁচের দেয়ালে। পার্কের বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত সবুজ চত্বর আর পুকুর পাড়ে তখনও এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। তবে এই স্নিগ্ধতা কেবল প্রকৃতির নয়, বরং মানুষের তৈরি এক অপূর্ব মেলবন্ধনের। ঘড়ির কাঁটা যখন ইফতারের কাছাকাছি, তখন পার্কের খোলা মাঠে দেখা যায় এক অনন্য দৃশ্য। সেখানে গোল হয়ে বসেছেন একদল তরুণ-তরুণী। কেউ আইটি ইঞ্জিনিয়ার, কেউ গ্রাফিক্স ডিজাইনার, কেউবা কল সেন্টারের কর্মী।
তাদের সামনে সাজানো ইফতারের থালা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দস্তরখানায় পাশাপাশি বসে আছেন সোহাগ হোসেন আর অনিমেশ পাল। ইমরান হুসাইনের তৃষ্ণা মেটাতে গ্লাসে পানি ঢেলে দিচ্ছেন রুম্পা নন্দী।
এটি কোনো বিশেষ দিনের আয়োজন নয়; বরং রমজান মাসজুড়ে যশোর আইটি পার্কের প্রাত্যহিক চিত্র। এখানে ধর্মের দেয়াল ভেঙে একাকার হয়ে গেছে সহমর্মিতা আর ভ্রাতৃত্ব।
যশোর আইটি পার্কে কর্মরত অধিকাংশ ইফতার খোলা আকাশের নিচেই আয়োজন করে আসছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তারা।
যশোরের এই সফটওয়্যার পার্কটি দক্ষিণবঙ্গের প্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্র। ওইখানে ৪৫টি কোম্পানিতে কাজ করেন দুই হাজারের বেশি কর্মী। দিনভর কোডিং, প্রোগ্রামিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন আর যান্ত্রিক ক্লান্তি শেষে বিকেলে সবাই যখন এই খোলা মাঠে সমবেত হন, তখন আইটি পার্কটি আর কেবল কর্মস্থল থাকে না, হয়ে ওঠে একটি বৃহত্তর পরিবার। অফিসের চার দেয়ালের এসি রুমে বসে ইফতার করার চেয়ে এই খোলা আকাশের নিচে মাটির কাছাকাছি বসে ইফতার করার আনন্দই আলাদা। আর যখন অমুসলিম সহকর্মীরাও মুসলিম ভাইদের সম্মানে ইফতারে শরিক হন, তখন সেটি হয়ে ওঠে সম্প্রীতির মেলবন্ধন।
ইফতার আয়োজনে আইটি পার্কে কর্মরত তন্ময় বিশ্বাস বলেন, আমি রোজা রাখি না, কিন্তু ইফতারের এই সময়টা আমার কাছে অত্যন্ত পবিত্র। সারাদিন আমার পাশের ডেস্কে বসে আমার সহকর্মী বন্ধুটি না খেয়ে কাজ করছে, তার ক্লান্ত মুখে ইফতারের সময় যে হাসি ফুটে ওঠে, সেই হাসির ভাগীদার হতে আমি প্রতিদিন আসি। এখানে আমরা কেউ হিন্দু বা মুসলমান হিসেবে বসি না, আমরা বসি এক একজন মানুষ হিসেবে।
আইটি পার্কে কর্মরত পূজা মন্ডল বলেন, আমাদের অফিসে যখন পূজোর সময় নাড়ু আর প্রসাদ আসে, আমরা সবাই যেমন উৎসবের আমেজে মেতে উঠি, ইফতারও আমাদের কাছে তেমনই। আমাদের অমুসলিম সহকর্মীরা আমাদের ইফতার কিনে আনেন, পরিবেশন করেন-এটি যে কতটা সম্মানের তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এই সম্প্রীতিই আমাদের কাজের শক্তি।
আর এক কর্মকর্তা ইমরান হুসাইন বলেন, আজকের বিশ্বে যখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা অনেক ক্ষেত্রে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন আইটি পার্কের এই উন্মুক্ত প্রান্তরের দৃশ্য এক বড় ইতিবাচক বার্তা। যখন প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অনেক সময় বিভেদ ছড়ানো হয়, তখন প্রযুক্তিকর্মীরাই সেই আঙিনায় বসে সম্প্রীতির উদাহরণ তৈরি করছেন।
এখানে ইফতারে কোনো জাঁকজমক নেই, আছে অকৃত্রিম আন্তরিকতা। মুড়ি-ছোলা, বেগুনি আর সামান্য কিছু ফল এই দিয়েই সাজানো হয় দস্তরখানা। কিন্তু এই সাধারণ খাবারের স্বাদ কয়েকগুণ বেড়ে যায় যখন তাতে মেশে ভালোবাসার স্পর্শ।
মন্তব্য করুন