
যশোরের কৃতি সন্তান সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই এর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। মুক্তিযোদ্ধা হাই স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি যশোর শহরের মুসলিম একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন। পরে ইসলামিয়া স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগে যোগদান করেন এবং ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গোপনে গড়ে ওঠা স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ (স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস) এর সদস্য হন এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সপক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯-৭১ সালে তিনি বৃহত্তর যশোর জেলা ছাত্রলীগের পাঠচক্র সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তিনি সেই আন্দলোনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যূত্থানে যশোরে তিনি অন্যতম ছাত্রনেতা ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে যশোরের যে ক'জন ছাত্রনেতা সবচেয়ে বলিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তিনি তাদের অন্যতম। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ আন্দোলন চলাকালীন অন্যান্য নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে তিনি যশোর কালেক্টরেট ভবন থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে আনেন ও সেই পতাকা পুড়িয়ে ফেলেন এবং সেখানে স্বাধীন বাংলার প্রতীকী পতাকা উড়িয়ে দিয়ে আসেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালোরাতে যখন সেনানিবাস থেকে আর্মি শহরে অগ্রসর হয়, তখন ছাত্র নেতাদের নেতৃত্বে যশোরের পালবাড়ি অঞ্চলে প্রথম প্রতিরোধ করেন। পরে ৪ এপ্রিল তিনি ভারতগমন করেন এবং ভারতের উত্তর প্রদেশের দেরাদুন জেলায় অবস্থিত চাকতারা ক্যান্টনমেন্টের অধীনে তানডাওয়াতে প্রথম ব্যাচে সশস্ত্র প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আব্দুল হাই বিএফএল (মুজিব বাহিনী) ঝিকরগাছা ও চৌগাছা থানার কমান্ডার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ঝিকরগাছা ও চৌগাছা অঞ্চলে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক সশস্ত্র লড়াইয়ে অংশ নেন। ১৯৭২ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ প্রতিষ্ঠিত হলে গাজী আব্দুল হাই ঐ দলে যোগদান করেন এবং ৮০'র দশকে বিভিন্ন সময়ে জাসদের যশোর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক কারনে গাজী আব্দুল হাই ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ এর শেষভাগ পর্যন্ত কারাভোগ করেন। এই সময়ে তিনি যশোর সিটি কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেন। গাজী আব্দুল হাই ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে জাসদ থেকে যশোর-৩ সদর আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ৯০এর দশকে তিনি দল ত্যাগ করেন এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয় ছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আব্দুল হাই ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, যশোর জেলা ইউনিট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দানশীল ব্যক্তি হিসেবে গাজী আব্দুল হাই সুপরিচিত ছিলেন। যশোর জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিক প্রতিষ্ঠান উন্নয়নে নিজ অর্থ অকাতরে দান করেছেন। দরিদ্র, পীড়িত ও অসুস্থ ব্যক্তির জন্য তিনি ছিলেন ভরসাস্থল। মুক্তিযুদ্ধকালীন ঝিকরগাছা আর্মি ক্যাম্প দখল করে তিনি সেখানে একটি হাসপাতাল চালু করেন। যেটি বর্তমানে ঝিকরগাছা সরকারি হাসপাতাল। বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আব্দুল হাই ২০১২ সালের আজকের দিনে ঢাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এ উপলক্ষে আজ মরহুমের পারিবারিক উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে এবং পরিবারের পক্ষে সকলের কাছে দোয়া চাওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন