
ভুয়া সনদে ডাক্তার-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির ভয়াবহ বাণিজ্য থামছেই না। একের পর এক অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশের পর সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অবৈধ মেডিকেল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো। শহরের প্রাণকেন্দ্রে, কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে প্রকাশ্যেই চলছে এমনই এক প্রতারণার কারখানা ‘প্যারামেডিকেল অ্যান্ড টেকনোলজি ফাউন্ডেশন (পিটিএফ)’। যা পরিচালনা করছেন বিএম শামীম নামে এক ব্যক্তি।
এর আগে গ্রামের কাগজে প্রকাশিত ভুয়া প্রতিষ্ঠানের সনদ কিনে চিকিৎসক-নার্স বানানোর একাধিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য তুলে এনে তিন পর্বের অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। ওই রিপোর্টের পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও কিছুদিন না যেতেই নতুন নামে, পুরোনো কৌশলে আবারও শুরু হয় একই অবৈধ কারবার।
পিটিএফ প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে, এখানে এ্যালোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী, নার্সিং, ডেন্টাল, প্যাথলজি, ফিজিওথেরাপি, গবাদি পশু চিকিৎসক ও ভূমি জরিপসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি দাবি করা হচ্ছে, এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। সাইনবোর্ডে ব্যবহার করা হয়েছে সরকারের নামে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর, যা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
অথচ স্বাস্থ্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী কোনো ফাউন্ডেশন বা বেসরকারি সংগঠন ইচ্ছামতো নার্সিং, ডেন্টাল, প্যাথলজি বা গ্রাম ডাক্তারি কোর্স পরিচালনা করতে পারে না। গ্রাম ডাক্তার, প্যাথলজি ও ডেন্টাল সহকারী কোর্স করাতে পারে কেবল সরকার স্বীকৃত মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস)। আর নার্সিং শিক্ষার জন্য অবশ্যই নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে মেডিকেল বিষয়ক কোর্স পরিচালনা করছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ যেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের এখতিয়ার, সেখানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতিতে এমন কার্যক্রম চালানো সম্পূর্ণ অবৈধ ও হাস্যকর।
সরেজমিনে শহরের কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে অবস্থিত পিটিএফ প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় কয়েকটি কক্ষ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। রিসিপশনে বসে থাকা এক নারী জানান, এখানে ভর্তি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কোনো কোর্সে ভর্তি হবেন কিনা এমন প্রশ্ন করা হয় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই।
তিনি দাবি করেন, বর্তমানে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি রয়েছেন এবং নতুন করে ভর্তি চলছে। এখানকার শিক্ষার্থীদের সরকারি সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে বলেও তিনি জানান। প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভর্তি ফি হিসেবে আদায় করা হচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। এছাড়া মাসিক বেতন দিতে হচ্ছে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দেওয়া হয় কোর্স শেষে সরকারি সার্টিফিকেট দেওয়া হবে।
বাস্তবে পিটিএফ কোনোভাবেই সরকারি সার্টিফিকেট দেওয়ার এক্তিয়ার রাখে না। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করতে তারা নিজেরাই একটি ওয়েব পোর্টাল তৈরি করেছে। ওই পোর্টালে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয় এবং কোর্স সম্পন্নকারীদের রোল নম্বর আপলোড করা থাকে। শিক্ষার্থীরা অনলাইনে নিজেদের রেজাল্ট দেখতে পেয়ে মনে করছেন এটি সরকারি ওয়েবসাইট। অথচ এটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও বেসরকারি একটি সাইট।
সূত্র জানায়, কারাগারের সমানে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উপজেলায় ‘স্বাস্থ্যকর্মী’ পরিচয়ে একদল নারী নিয়োগ দিয়েছে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা বলে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করে। এসব নারী মাসিক বেতনের বিনিময়ে কাজ করেন এবং নিজেদের স্বাস্থ্যকর্মী পরিচয় দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করেন। এভাবে গ্রামের সহজ-সরল মানুষ ও বেকার যুবকদের টার্গেট করে চলছে শিক্ষার্থী সংগ্রহ ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া।
এ বিষয়ে প্যারামেডিকেল অ্যান্ড টেকনোলজি ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিএম শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, একটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানির কাছ থেকে তিনি অনুমতি নিয়েছেন। বর্তমানে শুধুমাত্র পল্লী চিকিৎসক কোর্স করানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। অন্য কোর্সগুলো এখনো চালু হয়নি বলেও জানান।
তিনি আরও বলেন, সরকারি ম্যাসট থেকে অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা চলছে। অনুমতি পেলে এই সাইনবোর্ডে আর ব্যবসা করা হবে না। একই সাইনবোর্ডে জেলার একাধিক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মন্তব্য করুন