
যশোর শহরে প্রতিদিনই যেনো যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে যানজটের চিত্র। যানজটে পড়ে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, অভিভাবক, অফিসমুখী মানুষ ও রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সবমিলিয়ে যশোর এখন যানজটের শহর। এই যানজটে জেরবার নগর জীবন। কিন্তু এই যানজট নিরসনে নেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তাৎক্ষণিক নানা উপায়ে যানজট নিরসনের চেষ্টা হলেও তাতে খুব বেশি ফল আসছে বলেই নাগরিকদের বক্তব্য। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যানজট নিরসনে তাদের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই।
যশোর পৌরসভার সাধারণ নাগরিকরা জানান, যশোর শহরে প্রয়োজনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রিকশা, ইজিবাইক, থ্রি-হুইলার ও মোটরসাইকেল চলাচল করছে। এগুলো চলছে বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রহীনভাবে। বিশেষ করে মোটরচালিত রিকসার বেপরোয়া গতি যেনো প্রাণসংহারী হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই ছোট বড় অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটছে। নিয়ন্ত্রণহীন তিনচাকার যান, মোটরবাইকের আধিক্য, চালক ও নাগরিকদের আইন না মানার প্রবণতা, অপ্রতুল ও পরিকল্পনাহীন ট্রাফিক ব্যবস্থা দিনে দিনে যানজট সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। ফুটপাত দখলের প্রবণতায় পাঁয়ে হেঁটে চলাও দুষ্কর হয়ে পড়ছে। আর তাই এই শহরে পথ চলতে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন নাগরিক সমাজ।
যশোর পৌরসভা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যশোর পৌরসভায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ইজিবাইক ও প্রায় ৫শ’ প্যাডেল রিকসার (পায়েচালানো রিকসা) লাইসেন্স রয়েছে। সবমিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার ইজিবাইক ও প্যাডেল রিকসার অনুমোদন থাকলেও চলাচল করে ২০ হাজারের অধিক রিকসা ও বাইক। ফলে ছোট্ট এ শহরের অপ্রশস্ত সড়কগুলোতে যানজট লেগেই থাকে। বিশেষ করে স্কুল শুরু ও ছুটির সময় যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। তখন ট্রাফিক পুলিশের ‘চেয়ে চেয়ে দেখা’ ছাড়া যেন কোনো উপায় থাকে না। শহরের দড়াটানা, চিত্রা মোড়, জজকোর্ট মোড়, চৌরাস্তা ও মণিহার এলাকার যানজটের চিত্র অনেক পুরনো। এর বাইরে যানজটের ঢেউ আছড়ে পড়ছে শহরের অলিগলিতেও। যেসব রাস্তায় এতদিন যানজট বাঁধেনি সেসব সড়কও এখন রিক্সা-ইজিবাইকের জটে থমকে যাচ্ছে।
যশোর শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে যানজট পরিস্থিতি তেমন গুরুতর না হলেও বেলা ১১টার পর থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত শহরের বকুলতলা থেকে হাসপাতাল মোড়, জেল রোড এবং বকুলতলা থেকে দড়াটানা হয়ে চৌরাস্তা এমনকি আরএন রোড পর্যন্তও তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। আর এ সময়ে ছোটখাটো যানবাহনে চড়ে গন্তব্যে যাবার সময় যানজটে আটকে থাকে স্কুল-কলেজ ও অফিস, হাসপাতালগামীসহ জনসাধারণ। অন্যদিকে ট্রাফিক পুলিশ প্রধান সড়কগুলোতে ইজিবাইক এবং রিক্সার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে এ সকল ইজিবাইক ও রিক্সা শহরের অলিগলি এবং সংযোগ সড়কগুলো দিয়ে যাতায়াত করে থাকে। এ সকল অলিগলিতেও অতিরিক্ত মাত্রায় তিন চাকা ও দুই চাকার যানবাহন চলাচল করায় সেখানেও যানজট লেগে যায়।
শহরের রায়পাড়া এলাকার রিকসাচালক আলী হোসেন বলেন, প্রতিদিন বেলা ১১টার পর থেকে দুপুরের পর পর্যন্ত ঈদগাহ মোড়, দাড়াটানা, চিত্রা মোড়, চৌরাস্তা এলাকায় যানজট লেগেই থাকে। বিশেষ করে স্কুল ছুটির সময় এই জট আরও তীব্র আকার ধারণ করে। আর দড়াটানায় পার হতে তো আধাঘণ্টা লেগে যায়।
শহরের শংকরপুর এলাকার বাসিন্দা ইয়াসমিন আক্তার জানান, শহরে যে পরিমাণ ইজিবাইক আর ব্যাটারি রিকসা বেড়েছে, যে চলাচলের উপায় নেই। স্কুল বা কোচিং থেকে মেয়েকে আনতে গেলে জ্যামে আটকে থাকতে হয়। আবার দড়াটানায় রাস্তা এক পাশে ব্লক থাকলে গরীবশাহ মোড় ঘুরে রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে হয়। এতে দুর্ভোগ বাড়ে।
যশোরের যানজট প্রসঙ্গে সচেতন নাগরিক কমিটি সনাক যশোরের সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ শাহিন ইকবাল বলেন, যশোর শহর ছোট্ট শহর, শহরের পুরানো সড়কগুলো অপ্রশস্ত। এই শহরের নাগরিক বেড়েছে বহুগুণ। সেই সাথে যানবাহন চলছে পাঁচগুণ বেশি। বিশেষ করে অনিবন্ধিত রিকসা, ইজিবাইক সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। সেই সাথে রয়েছে অপ্রতুল ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাহীন ট্রাফিক ব্যবস্থা। আর চালকদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অসচেতনতা এবং নাগরিকদের আইন ভাঙ্গার প্রবণতা যানজটকে আরও প্রকট করে তোলা। হকার-ব্যবসায়ীদের ফুটপাত দখলের প্রবণতাও যানজটের অন্যতম কারণ।
জনউদ্যোগ যশোরের সদস্য বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা মাহবুবুর রহমান মজনু বলেন, নিয়ন্ত্রণহীন তিনচাকার যান, ইজিবাইক, মোটরসাইকেলের আধিক্য, ফুটপাত দখল যানজট সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। তাই শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো একমুখি করে দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফ্লাইওভার, বাইপাস সড়ক নির্মাণ এবং তা নিরাপদ করা, ভারী যানবাহন শহরে ঢুকতে না দেওয়া-এগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়া যানজট নিরসনে শহরের ভাঙ্গা সড়কগুলো সংস্কার করাও প্রয়োজন।
যশোর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মোরাদ আলী জানান, যশোর শহরের আকারের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। সেইসাথে ধারণ ক্ষমতার তুলনায় অনেকগুণ বেশি রিকসা, ইজিবাইক চলাচল করে। এছাড়া ফুটপাত দখলের প্রবণতাও রয়েছে। এসব কিছু মিলিয়ে যানজট সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। পৌর কর্তৃপক্ষ যানজট নিরসনে খুবই আন্তরিক। এই যানজট নিরসনে আমাদের বেশকিছু পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে পৌর কর্তৃপক্ষের একার পক্ষে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ট্রাফিক বিভাগসহ সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে যানজট সমস্যাকে অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব।
মন্তব্য করুন