
যশোরে তারের জঞ্জাল যেন দিন দিন বাড়ছেই। বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে অলিগলি-সবখানেই অগোছালোভাবে ঝুলছে তার। সৃষ্টি হচ্ছে দৃশ্য দূষণ, ঘটছে দুর্ঘটনা। চলতে-ফিরতে মাথার ওপর ঝুলে থাকা এসব তার জনভোগান্তি বাড়িয়েই তুলছে। শহরবাসীর অভিযোগ, একটি দৃষ্টিনন্দন আধুনিক নগরী গড়ার পথে এই তারের জঞ্জাল বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। গত ১১ মাসে যশোর শহর ও আশপাশে ছোট-বড় ২২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ৬ নভেম্বর বারান্দীপাড়া মোল্লাপাড়ায় বৈদ্যুতিক খুঁটির আগুন যেন নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে শহরবাসীকে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলেও নির্বিকার পৌরসভা। শহরজুড়ে প্রশ্ন-এই তারের জঞ্জাল থাকবে আর কতকাল?
যশোর শহর ঘুরে দেখা গেছে, দড়াটানা, চিত্রামোড়, এমকে রোড, চৌরাস্তা, আরএন রোড, মনিহার, বারান্দীপাড়া, বকচর, ঘোপ জেলরোড, চারখাম্বার মোড়, মুজিব সড়ক, বড়বাজার, কাঠেরপুল, পুরাতন কসবা-বেশিরভাগ এলাকাতেই বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ঝুলে আছে তারের স্তুপ। বিদ্যুতের লাইনের পাশাপাশি স্যাটেলাইট টিভি, ইন্টারনেট ও টেলিফোন লাইনের তার অগোছালোভাবে ঝুলছে। কোথাও কোথাও ছিঁড়ে পড়ে আছে রাস্তায়, আবার কিছু জায়গায় বছরের পর বছর পরিত্যক্ত তার ঝুলতে দেখা যায়। হাঁটতে চলতে মাথায় বাধছে ওইসব তার।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ঝুলন্ত তার একটি দৃষ্টিনন্দন শহর গড়ার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। প্রতিনিয়ত ঘটছে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা। শহরে যখন আধুনিকতার ছোঁয়া মোড়ে মোড়ে এলইডি লাইটসহ আলোকসজ্জা-সেখানে এই জঞ্জালপনা বড়ই দৃষ্টিকটু। দ্রুত এসব তার অপসারণের দাবি জানান তারা।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, চলতি বছরের গত ১১ মাসে বৈদ্যুতিক তারের কারণে ২২টি খুঁটিতে আগুন লেগেছে। এর মধ্যে ১০-১২টি ছিল বড় ধরনের। দ্রুত সময়ের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস না পৌঁছালে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। বিশেষ করে এপ্রিলে নলডাঙ্গা, মাইকপট্টি, নীলগঞ্জ ও এইচএমএম রোডে চারটি স্থানে আগুন লাগে। একইভাবে মে মাসেও চারটি খুঁটিতে আগুন ধরে-পুলিশ সুপারের বাংলো সংলগ্ন এলাকা, শংকরপুর বাস টার্মিনাল, চাঁচড়া চেকপোস্ট ও পতেঙ্গালীতে। ৩ মার্চে কুইন্স হাসপাতালের সামনে বড় ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পায় এলাকাবাসী। আগস্টে পৌরসভার প্রধান সড়ক ও মুজিব সড়কের দুইটি ঘটনায়ও বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পায় এলাকাবাসী। জুনে সিভিল কোর্ট মোড়ের আগুনে শহরজুড়ে আতঙ্ক তৈরি হয়। ফেব্রুয়ারিতে বড়বাজারের আগুনে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ ৬ নভেম্বর বারান্দীপাড়ার একটি খুঁটিতে আগুন লাগে। এতে করে তিনদিন ওই এলাকার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া প্রায় প্রতি মাসেই কোথাও না কোথাও এ ধরনের দুর্ঘটনা যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
মনিরুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ডিশ ও ক্যাবল অপারেটরদের লাইন, ইন্টারনেট ও টেলিফোন লাইনের তার অপসারণ পৌরসভার দায়িত্ব থাকলেও তারা কোনো উদ্যোগই নেয়না। এছাড়া দেশের কয়েক স্থানে মাটির নিচ থেকে এসব তার নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু যশোরে এ ব্যাপারে কখনই কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
যশোর ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার ফিরোজ আহম্মেদ বলেন, আগুন ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ এসব ঝুলন্ত তার। এগুলো আগুন বাড়াতে যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি নেভানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্ঘটনা বাড়ছে। তাই তারের জঞ্জাল অপসারণ জরুরি।
যশোর ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কো. লি. এর (ওজোপাডিকো) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মাহমুদ প্রধান বলেন, অগোছালো এসব তার বৈদ্যুতিক খুঁটির ছোট-বড় সমস্যার অন্যতম কারণ। কাজ করতে গিয়ে তাদের বেগ পেতে হয়, সময় বেশি লাগে এবং ঝুঁকি বাড়ে। জরুরীভাবেই এর সমাধান প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যশোর সিটি ক্যাবেলের পরিচালক (ফিন্যান্স) রেজাউল হাসান বলেন, ৩০ বছর ধরে তারা একই তার ব্যবহার করছেন। অথচ যশোরে ইন্টারনেট কোম্পানি রয়েছে ৩৫-৪০টি। অনেক অদক্ষ কর্মী তাদের ইচ্ছেমতো তার টানছেন, কয়েকদিন না যেতেই তা ছিঁড়ে পড়ছে। তবে, তাদের কোনো সমস্যা নেই। ইন্টারনেট ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে একটি নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যশোর জেলা ইন্টারনেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম জানান, অগোছালো তার তাদের জন্যও হুমকি। দুর্ঘটনায় তারাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। দেড় বছর আগে পৌরসভা সকল প্রতিষ্ঠানকে ডেকে একটি নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল যেখানে তার সংযোগের জন্য অনুমতি নেওয়ার নিয়ম চালু করতে চেয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর উদ্যোগটি ভেস্তে যায়। এরপর থেকে যার যেভাবে ইচ্ছা তার সংযোগ দিচ্ছেন। তাদের বৈধতার বিষয়ে বলেন, বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতারা দেখভাল করেন।
যশোর শহর পরিকল্পনাবিদ সুলতানা সাজিয়া বলেন, বিষয়টি এখন জাতীয় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতে এটি বড় বাধা। জঞ্জাল না সরাতে পারলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।
এ বিষয়ে যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, একটি নিয়মে আনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু নতুন নতুন কোম্পানি এসে অবৈধভাবে বিদ্যুতের খুঁটিতে তাদের তার ঝুলিয়ে দিচ্ছে। তাদের কাছে অভিযোগ এসেছে কিছু ব্যক্তি রাতে পৌরসভার বাল্ব চুরি করছে বা নষ্ট করে দিচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন