
যশোরের সীমান্ত এলাকা রঘুনাথপুসহ কয়েকটি গ্রামে সংঘবদ্ধ অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্র সরব হয়ে উঠেছে। লোক দেখানো বিভিন্ন ব্যবসার অন্তরালে মুখোশধারী ৭ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র ওই অস্ত্র ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে তথ্য মিলেছে। ওই চক্রের সাথে ওপার বাংলার সীমান্তবর্তী বনগাঁর এক অস্ত্র ব্যবসায়ী রয়েছে। চক্রটি যশোরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন অপরাধী মহলে অস্ত্র সরবরাহ করছে।
অল্প সময়ের মধ্যে এই অবৈধ ব্যবসা করে আয় করছে কাড়ি কাড়ি টাকা। চক্রটি সোনা চোরাচালান ও হুন্ডি কারবারের সাথেও জড়িত বলে অভিযোগকারীদের দাবি। সূত্রের দাবি, সম্প্রতি যশোরে জেলা ডিবির হাতে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র চালান ও আটক লিটন গাজী ও ইন্দুরের সাথেও ওই চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
এদিকে সীমান্তবর্তী অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্রের বিরুদ্ধে খোঁজখবর নেয়া শুরু করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা ডিবি। ওই সূত্রের তথ্যে ডিবির কাজ এগুচ্ছে বলে দাবি করেছেন জেলা ডিবির অফিসার ইনচার্জ মঞ্জুরুল হক ভ্ঞুা।
নির্বাচন ইস্যূকে সামনে রেখে বিভিন্ন মহল থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আটক ও অস্ত্র উদ্ধারের ব্যাপারে জোরালো দাবি ওঠে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়ের সময় জোরেসোরে দাবি ওঠে, অস্ত্র উদ্ধার করে নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির ব্যাপারে। এরপর পুলিশ সুপার আশ্বস্ত করেন আর তার বিশেষ দিক নির্দেশনায় অস্ত্র উদ্ধার কাজও শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে তথ্য মিলেছে, যশোরের শার্শার সীমান্ত এলাকা রঘুনাথপুরসহ কয়েকটি গ্রামে সংঘবদ্ধ অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্র সক্রিয় হয়ে ব্যবসা করছে। এর মধ্যে শুধু রঘুনাথপুরেই ৭ জনের একটি চক্র রয়েছে।
সূত্রের দাবি, ওই সাত জনের একজন গ্রুপ লিডার রয়েছে। ওই লিডার একাধারে মাদক চোরাকারবারি অস্ত্র ব্যবসায়ী ও সোনা চোরাচালানসহ হুন্ডির ব্যবসার প্রধান। যশোরে বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র ডেলিভারি কোথায় কি ভাব হবে এগুলো সবই তার হুকুমে হয়। ওই চক্রে ভারতীয় একজন অস্ত্র ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারি রয়েছে। ভিড়া বনগাঁ ইন্ডিয়ায় তার অবস্থান। ওই চক্রে রয়েছে আরো ৬ জন। ওই অস্ত্র ব্যবসায়ীদের প্রত্যেকেই চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও একাধিক মামলার আসামি। ওই চক্রের কাছে ২ টি অস্ত্র, ১০ রাউন্ড গুলি, ১টি দোনলা বন্দুক ৪ টি নাইম এম.এম পিস্তল রয়েছে। ওই চক্রের অপর একজনের ঘরে ২টি অস্ত্র ১০ রাউন্ড গুলি ও অপর একজনের ঘরে একটি দোনলা বন্দুক রয়েছে। মৎস্য চাষের পুকুরের পূর্বপাশে মেহগনি গাছের গোড়ায় ১০-১২ টি বোমা রেখে দেয়া হয়, যেকোনা অভিযান ও আক্রমন মোকাবেলা করতে। ওই চক্রে আরো দু’জন রয়েছে. যারা কর্মচারী হিসেবে কাজ করে। বেআইনী ও অবৈধ মালামাল রক্ষণাবেক্ষণ করে। প্রতিটি বেআইনী অস্ত্র কোথায় কিভাবে রাখা আছে এগুলো তারা জানে।
এই চক্রে অল্প বয়সী বেকার যুবকদের টার্গেট করে নামমাত্র টাকা দিয়ে ব্যবহার করছে। ওই চক্রে কয়েকদিন আগে ১০টি পিস্তুল ও দুইটি শর্ট গান ১টি দোনলা বন্দুকসহ ১০০ থেকে দেড়শ রাউন্ড গুলি ম্যাগজিন যুক্ত হয়েছে। এছাড়া তারা বেশ কিছু অটোমেটিক রাইফেলসহ ছোট পিস্তল বেচাকেনা করেছে। ওই চক্রের হাতে দামি অনেক ফোন রয়েছে, যার বেশিরভাগই ভারত থেকে চোরাই পথে আনা। তাদের কাছে বর্তমানে পঞ্চাশটির উপরে বোমা ও ২০-২২টি বড় রামদা রয়েছে বলে অভিযোগ।
ওই চক্রে অভিযান চালালেই অস্ত্র বেরিয়ে আসবে বলেও সূত্রের দাবি।
তথ্য মিলেছে, অস্ত্র ব্যবসা রক্ষণাবেক্ষণ ও বিভিন্ন গ্যাজাম ঝামেলায় সামাল দিতে মহড়া হিসেবে আরো কয়েকজন দেখাশোনা করে। বেনাপোল বাজারের একটি সুপার মার্কেটে চক্রের একজনের নিজ অফিস রুমের ড্রয়ারে নাইন এমএম অস্ত্র রেখে ব্যবসা করে। বেনাপোল বাজারের দুর্গাপুর রোড মোড়ে একটি চায়ের দোকানের আশপাশেও দেশিয় অস্ত্র রাখে ওরা। বেনাপোল বাজার ও রঘুনাথপুর এবং আরো কয়েকটি গ্রামে সোর্স লাগিয়ে অভিযান ও তল্লাশি চালালে ওই চক্রের লোকজন অস্ত্রসহ আটক হবে বলে সূত্রের দাবি। অস্ত্র ছাড়াও হুন্ডির টাকা পাওয়া যেতে পারে। অন্ত্রের বড় বড় চালান পারাপার করাসহ যশোরসহ ঢাকা পৌঁছে দেয়া হয় বলেও সূত্রের দাবি।
সূত্রের দাবি, সম্প্রতি সদর উপজেলার মধুগ্রামে পাঁচটি বিদেশি পিস্তলসহ আটক লিটন গাজী ও পরে আটক তার সহযোগী জালাল উদ্দিন মামুন ওরফে ইন্দুর ওই চক্রের অস্ত্রই দখলে রেখেছিল। গত ৩০ নভেম্বর অস্ত্র চালানসহ মধুগ্রামের লিটন গাজী ও ইন্দুর মামুনকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেনাপোল-শার্শার ওই চক্রের সম্পৃক্ততা আরো পরিস্কার হবে। লিটন গাজী ও ইন্দুর মামুন অস্ত্রের চালান কক্সবাজারে পৌঁছে দেয়ার কাজ করে আসছিল। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের উৎস, গন্তব্যসহ মধ্যস্থতাকারী ও অর্থ বিনিয়োগকারীদের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিলেও শার্শা সীমান্তের চক্রের নাম চলে আসবে।
এ ব্যাপারে যশোর জেলা গোয়েন্দা শাখার অফিসার ইনচার্জ মঞ্জুরুল হক ভ্ঞুা দৈনিক গ্রামের কাগজকে জানিয়েছেন, শার্শা কেন্দ্রিক অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্রের ব্যাপারে একটি সূত্র থেকে তিনি তথ্য পেয়েছেন। ওই ব্যাপারে কয়েকজন অফিসার কাজও করছেন। দ্রুতই অভিযান পরিচালনা করা হবে নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে।
এদিকে অস্ত্র উদ্ধার ইস্যুতে যশোরের নবাগত পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম পিপিএম জানিয়েছেন, সন্ত্রাসী অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে পুলিশ। বিশেষ করে অস্ত্র উদ্ধারে যথাযথ অভিযান চালিয়ে কাজ করা হবে। প্রত্যাশা অনুযায়ী আগামী নির্বাচন ও তফসিল ঘোষণার আগে দৃশ্যত আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করা হবে। অস্ত্র উদ্ধারের ব্যাপারে সকল থানা ও জেলা পুলিশের সকল ইউনিটকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন