মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সন্ত্রাসী আটক ও অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা

সেই ৪ কারখানার বিক্রি হওয়া অবৈধ অস্ত্রগুলো কোথায়?

দেওয়ান মোর্শেদ আলম
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:০৮ এএম
২০২২ সালে যশোর শহরের রাঙামাটি গ্যারেজ এলাকার বিসমিল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা অস্ত্র ও সরঞ্জাম ¦ ফাইল ফটো

যশোর শহর ও শহরতলীতে একে একে সন্ধান মেলা ৪টি অবৈধ অস্ত্র কারখানায় তৈরি করে বিক্রি করা সেই অস্ত্রগুলো এখন কোথায়? নির্বাচনকে সামনে রেখে এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যশোরের বিভিন্ন শ্রেলি পেশার মানুষের মধ্যে।

পুলিশ অনুসন্ধানে ২০২২ ও ২০২৩ সালে শহরতলী ভাতুড়িয়া এলাকায় দুটি, শংকরপুর এলাকায় একটি ও যশোর শহরের ব্যস্ততম রাঙামাটি গ্যারেজ এলাকায় সন্ধান মেলা অবৈধ অস্ত্র কারখানার অস্ত্রগুলো নতুন করে আলোচনায় আসছে। বিশেষ করে ওই অবৈধ কারখানা আবিস্কার ও পুলিশি অভিযানের আগে ওই কারখানাগুলোতে তৈরি হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রগুলো দীর্ঘ ৪ বছরেও উদ্ধার না হওয়ায় শঙ্কা বাড়ছে।

অস্ত্র, গুলি ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামসহ কারিগর ও কারখানা মালিক আটক হলেও অভিযানের আগে কোথায় কোথায় কাদের কাছে সেসব অস্ত্র-গুলি বিক্রি করা হয়েছে এসবের উত্তর খোঁজা হয়নি। যে কারণে বিগত সময়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখা যেতো বিভিন্ন মিছিল-মিটিং ও পাড়া-মহল্লায়। ওই কারখানাগুলো থেকে বিক্রি করা অস্ত্রগুলো কাদের দখলে তা শনাক্ত করে উদ্ধারের দাবি উঠেছে।

যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসী আটক অভিযান শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে একটি অভিযানে ৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারসহ সন্ত্রাসী আটক করা হয়েছে। এছাড়া ডিবি, র‌্যাব, পিবিআই ও যশোরের ৯ টি থানা পুলিশ অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযানে তৎপর রয়েছে।

২০২২ সালের ১৩ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ৮ টার দিকে যশোর জেলা গোয়েন্দা শাখা ডিবির একটি চৌকস টিম রাঙামাটি গ্যারেজ এলাকায় একটি অস্ত্র তৈরির কারখানার খোঁজ পান। ওখানে রীতিমত বিভিন্ন সরঞ্জাম যোগাড় করে অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছিলো। নিউ বিসমিল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চলছিলো ওই ভয়ানক কারবার। অভিযান চালিয়ে হাতে নাতে আটক হয় যশোর সদর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের আহম্মদ আলীর ছেলে ওই কারখানা মালিক আব্দুল কুদ্দুস, একই গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে সুমন হোসেন এবং শহরের বেজপাড়া এলাকার এলাহী বক্সের ছেলে আজিজুল ইসলামকে। ওই ওয়ার্কসপের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামাদিতে প্রমাণ দেয়, চক্রটি অত্যাধুনিক সব অস্ত্র তৈরি করছে আর সরবরাহ করছে।

ওই কারখানা থেকে উদ্ধার হয় দু’টি দেশি তৈরি ওয়ান সুটার গান যাতে ট্রিগার ও ফায়ার পিন সংযুক্ত হাতলসহ দৈঘ্য ৮ ইঞ্জি ২ সুতা, ৩ টি ৭.৬৫ পিস্তলের রিকয়েলিং স্প্রিং ও ব্যারেল সংযুক্ত স্লাইডার যার প্রত্যেকটিতে খোদাই করে মেড ইন ইউপি ৭.৬৫ লেখা আছে। এছাড়াও উদ্ধার হয়, ৩টি ৭.৬৫ বডি ও ৩টি হাতল, ৮টি ৭.৬৫ পিস্তলের অসম্পূর্ণ ম্যাগজিন, ১টি গ্রান্ডিং মেশিন, পিস্তলের গ্রিপ তৈরির ফাইবার সাতটি, পিস্তলের সেপ্টি লক একটি, ৪টি পিস্তলের তৈরি চ্যানেল, ৭ টি স্প্রিং, ৩টি হেমার, ২টি ট্রিগার, ৯টি পেন্সিল পলিশ, ২৫টি অক্ষর খোদাই করা পাঞ্চ, ৭টি বড় স্প্রিং, ৫ রাউন্ড পিস্তলের গুলি ও ১টি ড্রিল মেশিন উদ্ধার করা হয়।

এর ১০ দিন পরে ওই বছরের ২৩ অক্টোবর রাতে যশোরের চাঁচড়া ভাতুড়িয়া এলাকায় আরও একটি অস্ত্র কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। অস্ত্রসহ ইকবাল হোসেন নামে এক কারিগরও আটক হয়। তিনি চাঁচড়া ভাতুড়িয়া দাড়িপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। পূর্বপাড়া থেকে ইকবাল হোসেনকে একটি ওয়ান শুটারগানসহ আটক করা হলে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে কারখানার তথ্য জানায়। চাঁচড়ার মধ্যপাড়া মকছেদের পুকুরের পাশ থেকে মাটি খুঁড়ে আরও একটি ওয়ান শুটারগান উদ্ধার হয়। এরপর চাঁচড়া ভাতুড়িয়ার দাড়িপাড়ায় তার বাড়ির খাটের নিচ থেকে দুটি ওয়ান শুটারগানের গ্রিপ, দু’টি স্টিলের পাত, একটি ব্যারেল, ৪টি পাইপ, একটি বড় ব্যারেল পাইপ, দুটি লোহার ট্রেগারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এতে করে গোয়েন্দা শাখা নিশ্চিত হয়, এই ইকবাল একজন প্রশিক্ষিত অস্ত্র কারিগর এবং সে কারখানা চালায়।

সে সময় একে একে দুটি কারখানার সন্ধান মেলার ঘটনায় শঙ্কা বাড়তে থাকে মানুষের মধ্যে। ওই কারাখানার তৈরি অস্ত্র এর আগে আরো অনেকের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। সেগুলো উদ্ধারের ব্যাপারে কয়েকটি অভিযান চললেও পরে অভিযান স্থবির হয়ে পড়ে। অস্ত্রগুলো অল্প টাকায় এবং সহজলভ্য হওয়ায় যশোরাঞ্চলের রাজনৈতিক বলয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা কিনে অপতৎপরতা চালাতে থাকে। আর ওই দুটি কারখানা কেন্দ্রিক অস্ত্র উদ্ধার তদন্ত অনেকটা থমকে যায়।

ওই দুটি কারখানার পর ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ রাতে যশোরের আলোচিত শংকরপুর এলাকায় সন্ধান মেলে আরো একটি অস্ত্র তৈরির কারখানা। এর ৫ মাস আগে শহরের রাঙ্গামাটি গ্যারেজ এলাকায় আবিস্কার হওয়া কারখানা থেকে আটক হওয়া ওই কারখানা মালিকের সূত্র ধরে সন্ধান মেলে শংকরপুরের নতুন কারখানার। উদ্ধার হয় রিভলবার, ৪ রাউন্ড গুলি ও বিপুল পরিমান অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম। আটক করা হয় অস্ত্র কারিগর ও কারখানা মালিক শাহাদত হোসেনকে। ওই সময় ৩ মাস ধরে এই অস্ত্র কারখানা পরিচালানা করে বলে শাহাদৎ জানালেও গোয়েন্দা পুলিশ তথ্য পায় ৫ মাসের বেশি সময় এই অস্ত্র তৈরি ও বেচাকেনায় লিপ্ত ছিল শাহাদৎ।

এর আগে ২০১৯ সালে যশোরের ভাতুড়িয়ায় প্রথম অবৈধ কারখানার সন্ধান পায় পুলিশ। এসময় ওই কারখানায় মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করা হয়। আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, ম্যাগজিন, পিস্তল তৈরির সরঞ্জামসহ আটক করা হয় কারিগরসহ ৩ জনকে। এরা হচ্ছে যশোর সদর উপজেলার ভাতুড়িয়া দাড়িপাড়া গ্রামের আব্দুল গফুরের ছেলে অস্ত্র কারিগর কামরুল ইসলাম (৫০), কামরুলের স্ত্রী রাবেয়া সুলতানা (৩৫) ও ভাতুড়িয়া পশ্চিমপাড়া এলাকার নূর হোসেনের ছেলে আবুল বাশার (৪০)। আটক কামরুলের বাড়িতে এই অস্ত্র তৈরির কারখানার অবস্থান ছিল। এ নিয়ে যশোর শহর ও শহরতলীতে ৪টি অবৈধ অস্ত্র তৈরি কারাখানার সন্ধান মেলে। আটকের আগে বিভিন্ন সময়ে ওই কারখানায় কারিগররা ওয়ার্ডার নিয়ে হয়তো বড় কোনো চালান কেনো বিশেষ এলাকায় বা চক্রের কাছেও বিক্রি করেছে এমন ধারণা করে পুলিশ ও যশোরের ননা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

যশোরাঞ্চলের অনেকের কাছেই ওই ৪ কারখানার অস্ত্র থাকতে পারে এমন সন্দেহ ও ধারনা থেকে ডিবি পুলিশ জোরালো তদন্ত ও অনুসন্ধান শুরু করলেও কার্যত প্রাথমিক অভিযানে আটক উদ্ধারের পর আর তেমন আটক উদ্ধার হয়নি। তদন্তও একসময় থমকে যায়। যদিও ওই সময় রিমান্ডে আনা হয় কারখানা মালিক আজিজুল ইসলাম ও অস্ত্র কারিগর আব্দুল কুদ্দুসকে। রিমান্ডে তারা ওই সময় পুলিশকে জানায় কারাখানার মাটির নিচে পোতা রয়েছে অস্ত্র তৈরি করার আরো সরঞ্জাম। এরপর গত বছরের ২১ অক্টোবর মাটির নিচ থেকে ১টি পিস্তলের বডি, পিস্তলের রাইড, পিস্তলের ব্যারেল ২টা, টিগার ২ টা, হেমার ২টা, ছোট স্প্রিং ২টা। তবে বিক্রি করা অস্ত্রগুলো কাদের কাছে আছে, তা শনাক্ত করতে ও উদ্ধারে গোয়েন্দা সংস্থা নজরদারি শুরু করলেও ক’দিন পর অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম আর এগোয়নি। তথ্য ছিলো, ওই সব অস্ত্র রাজনৈতিক সেল্টারে থাকা উঠতি স্থানীয় রাজনীতিক ও উঠতি দুর্বৃত্তদের হাতে রয়েছে। সরকারের পট পরিবর্তনের পর নির্বাচনকে সামনে রেখে জোরালো দাবি উঠেছে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের। গত ৩০ নভেম্বর যশোরের নবাগত এসপির কাছেও মিডিয়ার নেতৃবৃন্দ এ দাবি তোলেন।

এসময় পুলিশ সুপার অস্ত্র উদ্ধারের উপর জোর দেন। নবাগত পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, জেলা ডিবি. ৯ থানাসহ জেলা পুলিশের সকল ইউনিট সক্রিয় ভূমিকায় রয়েছে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ব্যাপারে। যশোরে অস্ত্রবাজ চাঁদাবাজসহ কোনো অপরাধীর ছাড় নেই। যশোর সদর উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের মধুগ্রামে পুলিশি বিশেষ অভিযানে পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগজিন, ৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়েছে বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় লিটন গাজী নামে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়। এ অভিযান চলমান থাকবে বলেও জানান তিনি।

এ ব্যাপারে ডিবির ওসি মঞ্জরুল হক ভুঞা জানিয়েছেন, অস্ত্রবাজদের নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। অবৈধ ওই কারখানাগুলোতে কাদের চলাচল ছিলো, ওই অস্ত্রের কাঁচামাল কোথা থেকে আনা হয়েছে, কোথায় বিক্রির উদ্দেশ্যে এ অস্ত্র বানানো হয়েছিলো, আগে কারা কারা ওখান থেকে অস্ত্র কিনেছে এসব নিয়ে কাজ চলছে। যশোরাঞ্চলে অনেক দাগি বা চক্রের কাছে অস্ত্র চলে যেতে পারে সে প্রশ্নে অভিযান ও তদন্ত এগুচ্ছে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কুমিল্লায় ইসলামী ব্যাংকে টাকা তোলার হিড়িক

গেমসের ট্রায়াল দিতে ঢাকায় জিনাত

ঝিনাইদহে ছাত্রলীগের ২৪ জনের নামে মামলা, আটক ৩

নড়াইলে প্রভাব খাটিয়ে সরকারি গাছ কর্তনের অভিযোগ

বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ দেবে জাপান

জাইমা রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট, যুবক কারাগারে

হাম উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত হাজারের বেশি

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও তারুণ্য ধরে রাখবে কাঁকরোল

মণিরামপুরে ইমামুল হত্যাকাণ্ডে আটক হুসাইনের স্বীকারোক্তি

ঋণের প্রলোভনে টাকা আত্মসাত, মাহমুদাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা

পাওনা টাকা চাওয়ায় ভাতিজার মারধরে বৃদ্ধ নিহত

সেবা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা সাধারণ মানুষের

মণিরামপুর পৌরসভার উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা

এস আলমের প্রভাবমুক্ত ইসলামী ব্যাংকের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন

কেশবপুরে ভূমি সহকারীর বাড়িতে অজ্ঞান পার্টির হানা

একনেক সভায় ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব

পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে আনুশকার অস্বস্তি!

মণিরামপুরে নাতনীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক-১

তথ্য উপদেষ্টা / স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, থাকবে না দলীয় প্রতীক

X