
কোনো স্লোগান ছিল না, ছিল না দীর্ঘ বক্তৃতাও। তবু পুরো মিলনায়তজুড়ে নেমে আসে এক ধরনের গভীর নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যেই যেন ভেসে ওঠে কাটা পড়া গাছ, দূষিত নদী, প্লাস্টিকের স্তূপ আর সংকুচিত হয়ে আসা সুন্দরবনের প্রতিচ্ছবি। মোংলায় প্রথমবারের মতো মূকাভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশ ও সুন্দরবন রক্ষার বার্তা তুলে ধরা হয়েছে এক ব্যতিক্রমী আয়োজনে।
দুপুরে মোংলা সরকারি কলেজ মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’। আয়োজকদের দাবি, সুন্দরবন ও পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে মোংলায় এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ মূকাভিনয়ভিত্তিক আয়োজন।
একক পরিবেশনায় অংশ নেন তরুণ পরিবেশকর্মী শাহরিয়ার শাওন। সংলাপহীন পরিবেশনায় শরীরী ভঙ্গি ও প্রতীকী উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেন বন উজাড়, নদীদূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, বন্য প্রাণীর সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের নানা বাস্তবতা। কখনো তিনি হয়ে ওঠেন কাটা পড়া গাছ, কখনো অসহায় প্রাণীর প্রতিরূপ, আবার কখনো দূষণে বিপর্যস্ত নদীর প্রতিচ্ছবি। পুরো পরিবেশনা জুড়ে দর্শকসারিতে থাকা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নীরবে তা উপভোগ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, পরিবেশ নিয়ে এতটা দৃশ্যমান ও অনুভবনির্ভর উপস্থাপনা তারা আগে দেখেননি।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব ও প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন মোংলা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক কে এম রব্বানী। তিনি বলেন, “সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি উপকূলীয় মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। তরুণদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে সৃজনশীল উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন।”
মূখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’র সমন্বয়কারী ও পরিবেশকর্মী মো. নূর আলম শেখ। তিনি বলেন, “বিশ্বজুড়ে পরিবেশ আন্দোলন এখন শুধু নীতিনির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মানুষের অনুভূতি ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠছে। মূকাভিনয়ের মতো মাধ্যম মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।”
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার হাওলাদার ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস এম মাসুদ রানা। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রভাষক শ্যামা প্রসাদ সেন, ড. অপর্ণা অধিকারী, ড. অসিত বসু, প্রভাষক প্রদীপ অধিকারী, প্রভাষক এস এম মাহবুবুর রহমান, প্রভাষক মমতাজ খানম, প্রভাষক সাহারা বেগম এবং পরিবেশকর্মী মেহেদী হাসান। বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূল বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের একটি। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি দিন দিন বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সুন্দরবন রক্ষায় জনসচেতনতা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। অনুষ্ঠান শেষে কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, মূকাভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশের বিষয়গুলো তাদের কাছে আগের চেয়ে বেশি বাস্তব ও স্পর্শযোগ্য মনে হয়েছে।
আয়োজকেরা জানান, ভবিষ্যতেও পরিবেশ ও সুন্দরবন রক্ষায় এ ধরনের সৃজনশীল আয়োজন অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্তব্য করুন