
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি নামেনি উপকূলের আকাশে। কিন্তু বাগেরহাটের রামপালের পেড়িখালী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ততক্ষণে উপচে পড়া ভিড়। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ—কারও চোখে ঝাপসা অন্ধকার, কেউবা প্রায় দেখতেই পান না। সবার অপেক্ষা একটুখানি আলোর।
এই ভিড়ের মাঝেই সকাল থেকে ব্যস্ত একজন মানুষ। কখনো বৃদ্ধার হাত ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কখনো চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলছেন, আবার কখনো পুরো আয়োজন তদারকি করছেন।
প্রটোকলের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়া এই মানুষটি ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বর্তমানে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী। তবে উপকূলের মানুষের কাছে তিনি কোনো মন্ত্রী নন, তিনি সবার ‘আমাগো ফরিদ ভাই’।
২০০৯ সালে শুরু হওয়া তাঁর এই ব্যক্তিগত উদ্যোগ এখন আর শুধু একটি চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ নেই। এটি উপকূলের মানুষের জন্য এক ধরনের বার্ষিক আশার আয়োজন হয়ে উঠেছে। যেখানে চিকিৎসার পাশাপাশি থাকে নতুন করে দেখার স্বপ্ন।
এবারের ক্যাম্পে দিনভর প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ বিনামূল্যে ওষুধ ও চশমা পেয়েছেন। যাদের চোখে ছানি পড়ে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। গত দেড় দশকে এই উদ্যোগের মাধ্যমে লক্ষাধিক মানুষ নতুন করে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন।
এবারের আয়োজন ছিল আবেগঘনও। মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের প্রয়াত বাবার কথা স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, জীবনের শেষ সময়ে তাঁর বাবা এক চোখের দৃষ্টি হারিয়ে কতটা অসহায় হয়ে পড়েছিলেন।
স্থানীয়দের কাছে তিনি এখনো আগের মতোই সহজ-সরল। কোনো প্রটোকলের দূরত্ব নেই, নেই আনুষ্ঠানিকতার কড়াকড়ি। এলাকার এক বৃদ্ধ বলেন, “মন্ত্রী হইলেও ভাইজানের মনটা আগের মতোই আছে। আমাগো ফরিদ ভাই আমাদের মাঝেই থাকেন।”
চক্ষু সেবার পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট নিরসনেও কাজ করছেন তিনি। প্রতিটি ঘরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
পাশাপাশি তরুণদের জন্য একটি সবুজ ক্রীড়া পল্লী গড়ে তোলার উদ্যোগও রয়েছে। বিকেলে যখন মানুষজন মাঠ ছাড়ছিলেন, তাদের চোখে ছিল এক নতুন আলো—দেখার আলো, বাঁচার আলো। সেই আলোয় যেন মিশে ছিল এক বিশ্বাস—ক্ষমতার আসন মানুষকে বদলে দিতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা আর শিকড়ের টান তাকে বারবার ফিরিয়ে আনে নিজের মানুষের কাছে।
শেখ ফরিদুল ইসলাম সেই সত্যটাই আবারও মনে করিয়ে দিলেন—পদ নয়, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াই সবচেয়ে বড় অর্জন।
মন্তব্য করুন