মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা?

কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা?

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চান—এমন একটি দাবি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন অনলাইন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, তিনি মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত রায় মাথায় নিয়েই দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দাবি করেছেন, দলীয় প্রধানের দেশে ফেরার সম্ভাবনা সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও আলোচনা হয়েছে। তাদের মতে, নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে এবং সম্ভাব্য বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিকল্পনাও থাকতে পারে। এক প্রতিবেদনে এ খবরটি জানিয়েছে টাইমস অব বাংলাদেশ। তবে এসব দাবির সত্যতা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এসব বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক কৌশল বা দলীয় কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখার চেষ্টা। তাদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনগত পরিস্থিতিতে তাঁর সরাসরি দেশে ফেরা অত্যন্ত জটিল। তারা এটিকে বাস্তব পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বেশি ব্যাখ্যা করছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী ও গণহত্যা মামলায় ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফাঁসির রায় দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা দেশে দ্রুত সময়ে ফিরতে চান। সে জন্য যেসব প্রক্রিয়া গ্রহণ করা দরকার, তা আমরা করছি। তিনি যেভাবে ভারতে গিয়েছেন সেভাবেই বীরদর্পে দেশে ফিরবেন।’

এ ধরনের বক্তব্যের আসলে বাস্তবতা আছে, নাকি কর্মীদের চাঙা করার কৌশল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটু অপেক্ষা করুন। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা উপলক্ষে বিপুল জনসমাগম করতে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, এই মুহূর্তে দলের অসহায় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতেই দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা।

সম্প্রতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ইউরোপ আওয়ামী লীগের এক নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে তিনি বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে চান। তার এই মনোভাবের কথা ভারত সরকারকে জানানো হয়েছে। এমনকি তিনি আগামী ১৫ আগস্টের আগেই দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে ট্রাভেল পাসও চাইতে পারেন।’

সম্প্রতি দলের নেতাদের সঙ্গে টেলিগ্রামের একটি গ্রুপ কলে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তার এখন যে বয়স, তাতে আর সর্বোচ্চ কয়েক বছর বাঁচতে পারেন। দেশে এসে গণতন্ত্রের জন্য যদি তাকে ফাঁসির মঞ্চেও যেতে হয়, তাতেও তার কোনো কষ্ট থাকবে না’, বলেন ইউরোপ আওয়ামী লীগের ওই নেতা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এর পর থেকেই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। বহু নেতা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ২৭ অক্টোবর নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে। পরে চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করলে আরো চাপে পড়ে আওয়ামী লীগ।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের বড় অংশ এখন মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক ও আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে আসলেই শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্য কী শুধু বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ নাকি দলটির এ বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা রয়েছে, তা জানার চেষ্টা করেছে টাইমস।

দলটির কয়েক ধাপের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও সেখানে তিনি নিয়মিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।

শেখ হাসিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ভারত সরকার তার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের বৈঠক করারও সুযোগ করে দিচ্ছে। সেখানে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন।

দলীয় প্রধানের এমন দৃঢ় মনোভাবের পর দলের মাঠের নেতাকর্মীদের প্রস্তুত করতে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি সারা দেশে এখন নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছেন।

এদিকে, বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাম্প্রতিক ইস্যুতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তো তাকে (শেখ হাসিনা) ফেরত চাই, আইনিভাবে চাই। ভারতের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে অনুরোধ করেছি শেখ হাসিনাকে ফেরত চাই। আমরা চাই তিনি মামলা ফেস করুক।’

তবে এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার প্রত‍্যর্পণ ইস‍্যুতে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সাড়া না মিললেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্য বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘ক্ষমতার শেষ ১৫ বছরে মুখের জোরে শেখ হাসিনা টিকে ছিলেন। এখনো মুখের জোরে কর্মীদের চাঙ্গা করতে চাইছেন তিনি। শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন তার বিশ্বাসযোগ্য কোনো উপাদান দেখছি না।’

দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘শেখ হাসিনা কবে আসতে চান সেটি বড় কথা নয়। বরং তাকে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা সরকারের দায়িত্ব।’

আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, শেখ হাসিনা যেদিন দেশ ছেড়েছিলেন নিরাপত্তার শঙ্কায় তাকে ভারতে পাঠানো হয়েছিল। এখন দেশে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে। তাই এখন দেশে ফিরলে তার জীবনের নিরাপত্তার শঙ্কা নেই। তিনি আইন-আদালত ফেস করতে পারবেন। এ ছাড়া, বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারলে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করা সম্ভব বলেও মনে করছে দলটি।

ফাঁসির রায়, দেশে ফিরলে যা মোকাবেলা করতে হবে গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। রায়ে শেখ হাসিনাকে গণহত্যা, হত্যার নির্দেশ ও উসকানির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরে পূর্ণাঙ্গ রায়ে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশও দেওয়া হয়।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি), দুদক এবং হত্যা-গুমসহ একাধিক মামলা বিচারাধীন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দমন-পীড়ন ও আন্দোলন দমনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আইসিটি মামলার বিচার হয়। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও পূর্বাচল প্লট কেলেঙ্কারির মামলাও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে প্রথমেই আইসিটি মামলায় আত্মসমর্পণ করতে হবে। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম-খুন ও দুর্নীতির মামলাগুলো মোকাবেলা করতে হবে।’

দেশে ফিরলে ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা আপিল করতে পারবেন কি না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে আপিল করার নির্দিষ্ট সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে। তিনি আপিল করতে পারবেন কি না সেটি সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত দেবে।’

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি মামলাগুলো ফেস করলেন না অথচ এখন ফাঁসির আদেশ নিয়ে দেশে এসে মামলা ফেস করবেন, এটির সত্যতা আছে বলে মনে হয় না। এটি শেখ হাসিনার পলিটিক্যাল স্ট্যান্টবাজি। তিনি দেশে এসে ফেস করতে চাইলে সেটি ভালো কথা।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বর্তমান বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের মতে, এই ধরনের আলোচনা মূলত দলীয় কর্মীদের সক্রিয় রাখার কৌশল হতে পারে।

তবে অন্যদিকে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ফিরে এলে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী তাকে আত্মসমর্পণ ও আদালতের মুখোমুখি হতে হবে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আলোচনা এখনো মূলত রাজনৈতিক বক্তব্য, দলীয় দাবি এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে তিনি দেশে ফিরবেন কি না—এ নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সরকারি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র : টাইমস অব বাংলাদেশ

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

কেশবপুরে শরীকানা পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

পাবনায় হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, নিহত ৩

রাজশাহীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়লো স্বর্ণের দাম

ফের বাড়ল তেলের দাম

বিশ্বকাপ ইতিহাসে পেনাল্টি গোলের রেকর্ডে লিওনেল মেসি

দেশে ফিরলেন ৪৫১৫৮ হাজি, মৃত্যু ৪৯

নওগাঁয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ সুপারের সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা

যশোরে স্ত্রী হত্যায় স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা, চাকু উদ্ধার

কালীগঞ্জে সর্বত্র মাদকের রমরমা ব্যবসা / হুমকির মুখে যুবসমাজ, আতঙ্কে অভিভাবকরা

২০২৬-২৭ বাজেট: যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে

দেশের ১৪ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস

নড়াইলে ইয়াবাসহ যুবক গ্রেফতার, ২ মাসের কারাদণ্ড

স্ত্রীকে তালাক দিয়ে শাশুড়িকে বিয়ে!

আদিতমারীতে তুচ্ছ বিরোধের জেরে সংঘর্ষ, কিশোর নিহত

X