
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোরে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক পড়েছে। রঙিন, সাদাকালো পোস্টার, প্যানাসহ নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। শুধু যশোর শহর নয়, পাড়া-মহল্লা গ্রামগঞ্জেও এই অবস্থা লক্ষ্য করা গেছে। তবে প্রশাসন বলছে, তারা নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের চিত্র বাড়ছে। হাট-বাজার, সড়ক ও পাড়া-মহল্লা কোথাও নিয়ম মানার তেমন কোনো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। জেলায় নির্বাচনী প্রচার জোরদার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত আচরণবিধি।
জেলার বিভিন্ন এলাকা ও গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, নিয়ম ভেঙে রঙিন পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন টাঙিয়ে প্রার্থীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন।
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, এবার প্রার্থীদের কোনো ধরণের পোস্টার ব্যবহারের অনুমতি নেই। কিন্তু বাস্তবে যশোর শহর ও আশপাশের এলাকায় চলন্ত ইজিবাইক ও রিকশার গায়ে রঙিন পোস্টার লাগিয়ে প্রচারণা চালাতে দেখা যাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো সচল যানবাহনে পোস্টার লাগানো এবং যান্ত্রিক যানবাহনে চড়ে মিছিল বা শোভাযাত্রা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ছাড়া ঘরবাড়ি, দোকান, অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, গাছ এবং বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটিতে পোস্টার লাগানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এসব নিয়ম মানার কোনো নজির দেখা যাচ্ছে না।
যশোর-৩ (সদর) আসনে ছয়টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আব্দুল কাদেরের প্রচারণা শহরজুড়ে বেশি চোখে পড়ছে। অন্য প্রার্থীরাও তাদের মতো করে প্রচারণা চালালেও ওই দুই প্রার্থীর পোস্টার ও ব্যানারে শহরের বিভিন্ন এলাকা ছেয়ে গেছে। ফলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও তাঁদের বিরুদ্ধেই বেশি উঠছে।
পৌর এলাকার কয়েকটি ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, অনেক বাড়ির দেয়ালে এখনো ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের রঙিন পোস্টার সাঁটানো রয়েছে। একইভাবে শহরের বেশিরভাগ ইজিবাইক ও রিকশার গায়েও এসব পোস্টার দেখা গেছে।
তফসিল ঘোষণার পর জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে পুরোনো পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ খুব একটা চোখে পড়েনি। রেলগেট, নিউ মার্কেট, মণিহার, দড়াটানা, মুজিব সড়ক ও রেলস্টেশন এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটিতে এখনো ঝুলছে নির্বাচনী পোস্টার, রঙিন ব্যানার ও ফেস্টুন।
এ ছাড়া চাঁচড়া চেকপোস্ট, পুলেরহাট বাসস্ট্যান্ড, চিত্রা মোড়, যশোর কোর্ট মোড়, প্রধান ডাকঘর, সার্কিট হাউস, জেলা আইনজীবী সমিতির ভবনসহ সরকারি বিভিন্ন স্থাপনার দেয়ালেও আচরণবিধি উপেক্ষা করে পোস্টার ও রঙিন ব্যানার টাঙানো হয়েছে।
এর মধ্যে সরকারি এমএম কলেজের হোস্টেলের দেয়ালে পোস্টার লাগানো এবং ইজিবাইকের পেছনে পোস্টার ব্যবহারের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। যৌথবাহিনীর উপস্থিতিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামীম হোসাইন এই আদালত পরিচালনা করে জরিমানাও আদায় করেন।
তবে রঙিন পোস্টার নিয়ে যশোর-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, শহরের বিভিন্ন স্থানে সাঁটানো বা রিকসা-ইজিবাইকের পেছনে লাগানো রঙিন পোস্টার তাদের নয়। এটি কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ। এ ব্যাপারে তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছেন।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, “নির্বাচনী প্রচারণার নামে এ ধরনের কোনো স্টিকার আমরা কখনোই তৈরি করিনি। আচরণবিধি সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণভাবে অবগত এবং তা মেনে চলি। যারা এসব স্টিকার তৈরি, ব্যবহার বা প্রচার করছেন, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা আমাদের সমর্থকও নন। অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।”
নির্বাচনী আচরণবিধি প্রসঙ্গে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান জনিয়েছেন, আচরণবিধি অনুযায়ী কোনো প্রার্থী বা তার কর্মী-সমর্থক নিয়ম ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদন্ড অথবা দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। প¬াস্টিক লেমিনেটেড পোস্টার ব্যবহার এবং দুপুর ২টার আগে ও রাত ৮টার পরে মাইক ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না উলে¬খ করে তিনি বলেন, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে জেলাজুড়ে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে। প্রসঙ্গত প্রতিবেদটি গত ১৯ থেকে ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সাউথ এশিয়া সেন্টার ফর মিডিয়া ইন ডেভেলপমেন্ট (সাকমিড) ও ইউনেস্কো আয়োজিত “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অখণ্ডতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাফ্যাক্ট-চেকিং” শীর্ষক প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান ও কৌশল প্রয়োগ করে প্রস্তুত করেছেন প্রতিবেদক । প্রশিক্ষণের একটি অংশ ছিল নির্বাচনী আচরণ বিধি।
মন্তব্য করুন