
সাংবাদিকদের কাছে গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনা প্রত্যাশা করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে এমন সমালোচনাই তারা চান, যা দেশ পরিচালনায় সহায়ক হবে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে দিকনির্দেশনা দেবে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) ঢাকার একটি হোটেলে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, আমরা ইনশাল্লাহ দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হলে এমন আলোচনা-সমালোচনা চাই, যেটা আমাদের দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। শুধু সমালোচনা করার জন্য সমালোচনা নয়। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, হিংসা-প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা একটি মানুষ, একটি দল বা যেভাবে আমরা বিবেচনা করি—তার পরিণতি কী হতে পারে আমরা দেখেছি ৫ আগস্ট। আমি সেজন্যই সবাইকে অনুরোধ করব দলমত নির্বিশেষে আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে; কিন্তু আমরা যদি চেষ্টা করি, তাহলে সেই মতপার্থক্যটাকে মতপার্থক্যের মধ্যে রেখে আলোচনার মাধ্যমে সেটির অনেক সমস্যার সমাধান হয়তো আমরা বের করে আনতে সক্ষম হবো।
কোনোভাবেই মতপার্থক্য যাতে মতবিভেদের পর্যায়ে চলে না যায়- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, মতবিভেদ হলে, বিভেদ হলে জাতিকে বিভক্ত করে ফেললে কী হতে পারে আমরা দেখেছি। আজকে সেজন্যই অনেকের মুখে অনেক হতাশার কথা আমরা শুনি; কিন্তু তার পরও আশার কথা হচ্ছে যে—তাদের কাছে ভবিষ্যতের চিন্তাও আছে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আছে।
যুক্তরাজ্যে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর সপরিবারে দেশে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর ৩০ ডিসেম্বর তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যান। এর ১০ দিনের মাথায় শনিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। এর পরদিন প্রথম কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন তারেক রহমান।
তারেক রহমান বলেন, দেশে ফিরে আসার পরে আমি যে কয়বার আমার বাইরে যাওয়ার একটু বেশি সুযোগ হয়েছে, আমি সাভারে গিয়েছিলাম, আরও কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে নতুন প্রজন্ম একটি গাইডেন্স চাইছে, নতুন প্রজন্ম একটি আশা দেখতে চাইছে। শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, আমার কাছে মনে হয়েছে প্রত্যেকটি প্রজন্মই মনে হয় কিছু একটি গাইডেন্স চাইছে। আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের কাছে হয়তো অনেক প্রত্যাশা; সব প্রত্যাশা হয়তোবা পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা রাজনীতিবিদরা যদি ১৯৭১ সাল, ১৯৯০ সাল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই সবগুলোকে সামনে রেখে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য কাজ করি, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা জাতিকে একটি সঠিক ডাইরেকশনে নিয়ে যেতে সক্ষম হব।
দেশে দেড় কোটির মতন কৃষক আছেন মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, ‘এত বিশাল সংখ্যক মানুষ- যারা ২০ কোটি মানুষের খাওয়া পরার ব্যবস্থা করছেন, খাওয়ার-অন্নের সংস্থান করছেন, সেই এত বড় সমাজটাকে কীভাবে সাপোর্ট দেওয়া যায়। তাদের হয়তো সেভাবে বলার সুযোগ নেই। এখানে আপনারা সংবাদপত্রের যারা কর্মী আছেন আপনারা আপনাদের কিছু সমস্যার কথা বলেছেন, আপনাদের সমস্যাটা আমাদের জন্য শুনতে জানতে সহজ হয়, বিকজ আমাদের জন্য একটা ভেন্যু আছে, যেখানে আমরা আলাপ করতে পারি। ওই কৃষকগুলো, যাদের কোনো ভেন্যু নেই, যারা এ রকম একটা প্রোগ্রাম অর্গানাইজ করতে পারছেন না, তারা কীভাবে বলবে কথাগুলো। কাজেই তাদের কথা তো আমাদের জানতে হবে।’
প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা তুলে ধরে তারেক বলেন, ‘মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষার ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছিলেন। পরবর্তীতে আগামী নির্বাচনে ইনশাল্লাহ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে; এই নারীরাই শিক্ষিত হয়েছে, এদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা। একটু আগে আমি যে ফ্যামিলি কার্ডটির বিষয়ে বলেছিলাম, সেটির লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হচ্ছে সেটাই- এই নারী সমাজকে গড়ে তোলা। আমাদের হিসাব মতে বাংলাদেশে চার কোটি ফ্যামিলি আছে। আমরা যদি পরিবার হিসেবে ভাগ করি, এভারেজে একটি পরিবারে পাঁচজন করে সদস্য ধরা হয়েছে।
কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি কার্ড চালুর ভাবনা রয়েছে জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, একটি বড় সমস্যা হচ্ছে হেলথ ইস্যু। বাংলাদেশে ২০ কোটি মানুষ। আমরা স্লোগান দিয়ে হয়তো বলতে পারি যে, ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করব, আমরা সকলকে স্বাস্থ্য সুবিধা দেব’।
তারেক রহমান বলেন, ‘যেকোনো ধরনের সেটি বাইপাস হোক, কার্ডিয়াক হোক, ক্যানসার হোক— সবরকম চিকিৎসা ইউকে দেয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে, এই কাজটা করতে গিয়ে উন্নত দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে। তারা এখন চাচ্ছে প্রিভেনশন (রোগ প্রতিরোধ)। মানুষকে যদি স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন করা হয় যে, ‘এই এই খাবারগুলো খেও না, তাহলে তোমার কিডনি সমস্যা হবে না’; ‘এই খাবারগুলো খেও না, তাহলে তোমার হার্টে সমস্যঅ হবে না’; ‘এই খাবারগুলো খেও না, তাহলে তোমার ডায়বেটিক হবে না’—মানুষকে যদি এভাবে সচেতন করা যায়; তাহলে দেখা গেছে, তাতে রাষ্ট্রের খরচ অনেক কমে আসে, মানুষও সুস্থ থাকে। এবং এটার উপর বেইস করে যেহেতু ইউরোপেই এই কাজটা চলছে, আমরা এমন হেলথ কেয়ারার অ্যাপয়েন্ট করতে চাই।’
তারেক রহমান আরও বলেন, সামনে আমাদের অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ আছে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন মতপার্থক্য আছে। এসব মতপার্থক্য নিয়ে যেন আলোচনা হয়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে আহ্বান জানাব।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সম্পাদক ও সাংবাদিকরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, কালাকানুন প্রত্যাহার এবং সাংবাদিকদের জন্য সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান।
এছাড়াও দেশের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার তিন শতাধিক সাংবাদিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন