
সদা সত্য কথা বলিব। মিথ্যা বলা মহাপাপ। মিথ্যাবাদী কষ্ট পায়। এই লাইনগুলো আমরা ছোটবেলায় পড়ে এবং শুনে শুনে বড়ো হয়েছি। অজান্তেই মনের ভিতরে গেঁথে আছে। বড়ো হয়ে বিশ্বাস করতে শিখেছি "যদি দণ্ড সহিতে হয় তবু মিথ্যা বাক্য নয়"। সত্য বলার অভ্যাস মানুষের আত্মবিশ্বাস ও আত্মার শক্তি বৃদ্ধি করে। মানুষের জন্য, সমাজের জন্য এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমাদের সমাজে শিশুদের অনুভূতি বা তাদের বোধগম্যতা নিয়ে একেবারেই চিন্তা করা হয় না। তারা তাদের চারপাশে যা দেখে বা অনুভব করে তাই শেখে এবং পরবর্তীতে নিজের জীবনেও তারই প্রতিচ্ছবি পড়ে। আমাদের অধিকাংশ বাবা-মায়েরা এই বিষয়ে সচেতন নয়। তারা অবলীলায় সন্তানের সামনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ- আলোচনা, সমালোচনা করে থাকে। শিশুরা তাদের মতো করে বোঝে, তারা সত্য- মিথ্যা আলাদা করতে পারে এবং একসময় বুঝে যায় মিথ্যা বলা সহজ। নিজের ভুল-ভ্রান্তি আড়াল করার জন্য অনেক সময় দরকারিও বটে। সেই মিথ্যা শব্দ ব্যবহারের অভ্যাস শুধু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশের সকল স্তরে। গুরুজনেরা বলতেন একটি মিথ্যা ঢাকতে দশটি মিথ্যা বলতে হয়। সেই দশটিকে বিশ্বাস যোগ্য করতে একশোটি মিথ্যাইও কুলোয় না। এটাই বাস্তব যা আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি। মিথ্যার মহীরুহের তলায় সত্য ক্ষীণ হয়ে আসছে। শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অতীত বর্তমান সবসময়ই আমরা উদাসীন। কেন যেন মনে হয় দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের একটি বিভ্রান্তিকর অবস্থার মধ্যে বড়ো হতে হচ্ছে। ভুল ইতিহাস, পাঁচমিশালি সংস্কৃতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থার বিবিধ পার্থক্য তাদের বিভ্রান্ত করে তুলছে। আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা থেকে সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের ভিন্ন দিকে চালানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। নিম্নবিত্ত শিশুদের সাথে যা কিছু হচ্ছে সবই কী শিশুদের কল্যানে হচ্ছে? এখানে মিথ্যার কোনো বেসাতি নেই তো! অনেক কিছু নিয়েই সংশয় দানা বাঁধে। আদর্শিক শিক্ষার প্রয়োজন শিশু বয়সেই। তাহলে সেটা মননে গেঁথে যায়। বড়ো হয়ে ইচ্ছা করলেও পুরোপুরি আদর্শচ্যুত হতে পারে না। আজকের শিশু আগামী দিনের কর্ণধার, তাদেরকে ভুল পথে চালানো অথর্ব সমাজ গড়ার পক্ষে যথেষ্ট। প্রতি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ থাকলেও মাদ্রাসায় ভর্তির হিড়িক চোখে পড়ার মতো। অবশ্যই ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার প্রসার হতেই পারে সেটা দোষের নয় কিন্তু তা সুস্থ, স্মার্ট পরিবেশে হওয়া উচিত। আর যদি ধর্মীয় শিক্ষাই জনসাধারণের চাওয়া হয় তাহলে তেমন গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। সম্মৃদ্ধ, মানবিক মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যবস্থা সর্বত্র গড়ে উঠুক, প্রহসনের নয়। কিন্তু আমাদের দেশে মাদ্রাসাগুলোর যে বেহাল দশা, বিশেষ করে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা যারা বড়ো হয়ে কাজ করে সংসারের হাল ধরতে পারতো, পরিবারের উন্নতি করতে পারতো তারা মাদ্রাসায় পড়ে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে, পরের বাড়ি খেয়ে সারাজীবন মানুষের কাছে হাত পেতে খাওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। কঠোর শাসনে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব কৈশোর। ভুল ইতিহাস, ভুল সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হচ্ছে। কারণ তাদের বাবা-মাকেও এমন বোঝানো হয়েছে বা হচ্ছে যে শুধু পরকালের জন্যই এ জীবনে যা কিছু করা। তারাও পরকালের পথ প্রসস্থ করতে সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠায়। একজন মাকে দেখলাম মাদ্রাসায় ছেলের মাথায় পাগড়ি দেবে বলে সাহায্য চেয়ে বেড়াচ্ছে। বেশ আনন্দিত মুখ। জিজ্ঞাসা করলাম এরপর কী করবে? বড়ো হয়ে বিয়ে শাদী করলে কী করে খাবে? পরিবারকে খাওয়াবে? মায়ের মুখটা শুকিয়ে গেল। ভাবেনি এমন প্রশ্ন কেউ করতে পারে! বললো ''আল্লাহ খাওয়াবে''। সত্যি বলতে এইসব চিন্তা এদের মাথায়ই আসে না। মা বাসাবাড়িতে কাজ করে, বাবা রিক্সা চালায় অথবা গ্রামে দিনমজুর, যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সন্তানকে কর্মঠ করে তৈরি করা। যাতে সাধারণ শিক্ষা বা কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে পারে। অথচ এদের সন্তানই বেশির ভাগ অস্বাস্থ্যকর মাদ্রাসায় পড়ে। ধর্ম রক্ষার দায়িত্ব কী শুধু গরীব মানুষের? তাদের এমন মগজধোলাই কীভাবে হলো মাথায় আসে না। মাদ্রাসায় পড়ানো কর্তব্য মনে হয় ধনী শ্রেণির, যাদের ভাত- কাপড়ের চিন্তা করতে হয় না। যাদের পেটে ভাত নেই তারা ধর্মের গূঢ় মাহাত্ম্য কতটুকু উপলব্ধি করতে পারে! সাধারণ ধর্মীয় শিক্ষা সবার জন্য যা চিরকাল ছিল কিন্তু এখন মনে হয় কোনো অদৃশ্য টানে ওদের ব্যবহার করা হয়। ওদের ভুলভাল বোঝানো সহজ, ওদের মিছিলে নেওয়া সহজ। পরকালের ভয় দেখিয়ে যা খুশি করিয়ে নেওয়া অনেক সহজ। এগুলো কী পরোক্ষভাবে মিথ্যাচার নয়? যদি উপর থেকে নিচ অবধি এভাবে আমরা মিথ্যাচারের গোলকধাঁধায় ঢুকে যাই আমাদের সন্তানরা সত্য বলার সাহস পাবে কীভাবে? কোথায় পাবে এই শিক্ষা যে- 'সত্য সুন্দর, সত্যই আলো', সত্যই মুক্তি।
মন্তব্য করুন