মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় নতুন ভাবনা : সচেতনতা, নবায়নযোগ্য শক্তি ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন

সৈয়দ জাকির হাসান
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৯ পিএম
সিনিয়র সহকারী সচিব সৈয়দ জাকির হাসান

বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি সংকট ক্রমেই গভীরতর হচ্ছে, এবং বাংলাদেশও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু সংকটের বড় একটি কারণ শুধু উৎপাদনের ঘাটতি নয়—বরং আমাদের অপ্রয়োজনীয় অপচয় ও অদক্ষ ব্যবহার। দৈনন্দিন জীবনে আমরা সহজেই লক্ষ্য করি—অপ্রয়োজনে লাইট, ফ্যান, এসি চালু রাখা, ছোট দূরত্বে গাড়ির ব্যবহার, কিংবা অফিস ও মার্কেটে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা—এসবই জাতীয় সম্পদের অপচয়কে বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই এই সংকট মোকাবেলায় প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে আচরণগত পরিবর্তন।

তবে শুধু সাশ্রয় নয়, এখন প্রয়োজন বিকল্প ও টেকসই জ্বালানি উৎসের দিকে অগ্রসর হওয়া। বিশ্বের বিভিন্ন দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ু বিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ইতোমধ্যে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই মডেলগুলো দেখায় যে ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিকল্পনা করলে নবায়নযোগ্য শক্তি একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশেও উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপগুলোতে বায়ু শক্তির সম্ভাবনা রয়েছে, যা কাজে লাগানো গেলে জাতীয় গ্রিডের উপর চাপ কমানো সম্ভব।

জাপানের মতো দেশ আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারা ট্রেনলাইন ও মহাসড়কের পাশের অব্যবহৃত জায়গায় সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, ফলে একই অবকাঠামো দ্বৈত কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশেও রেললাইন, ফ্লাইওভার, হাইওয়ে এবং সরকারি খালি জমিতে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন হাইটেক পার্ককে “গ্রিন এনার্জি হাব” হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এসব পার্কের ছাদ, পার্কিং এলাকা কিংবা খালি জায়গায় সোলার প্যানেল স্থাপন করে নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব। এছাড়া, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমেও জ্বালানি উৎপাদনের বড় সুযোগ রয়েছে। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে জাপান, সুইডেন ও ভারতের মতো দেশগুলো বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পরিবেশ ও জ্বালানি—দুই সমস্যারই সমাধান করেছে। বাংলাদেশেও ঢাকার বিপুল বর্জ্য যদি আলাদা করে সংগ্রহ করা যায়, তাহলে তা থেকে বায়োগ্যাস বা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ব্যক্তি পর্যায়ে এটি জনপ্রিয় করা যেতে পারে—যেমন বাসাবাড়িতে জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার তৈরি, ছোট বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন, কিংবা প্লাস্টিক ও রিসাইক্লেবল বর্জ্য বিক্রি করে আয় করা। এতে পরিবেশ যেমন পরিষ্কার থাকবে, তেমনি এটি একটি ছোট আয়ের উৎসও হতে পারে—অর্থাৎ, সঠিক ব্যবস্থাপনায় ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যক্তি পর্যায়েও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের এনজিও খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন, BRAC বা Grameen Shakti ইতোমধ্যে গ্রামীণ পর্যায়ে সৌরশক্তি ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে সফল কাজ করেছে। একইভাবে তারা শহুরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কমিউনিটি সচেতনতা এবং ক্ষুদ্র আয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এনজিওগুলো স্থানীয় জনগণের সাথে সরাসরি কাজ করে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং ছোট স্কেলের প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম।

সরকারের করণীয়ও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহের বাধ্যতামূলক নীতি, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো উন্নয়ন, এবং বায়োগ্যাস বা ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্রকল্পে প্রণোদনা দিতে হবে। পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনগুলোকে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

এক্ষেত্রে স্বল্প খরচের তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন—মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহের সময়সূচি জানানো, SMS/USSD ভিত্তিক সচেতনতা বার্তা, IoT ভিত্তিক স্মার্ট ডাস্টবিন, এবং ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তদারকি করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে নগর এলাকায় ছাদবাগান, গাছ লাগানো এবং “cool roof” প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরের তাপমাত্রা কমানো সম্ভব। এর ফলে এসি ব্যবহারের প্রয়োজন কমে যায়, যা সরাসরি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সহায়তা করে।

এখন সময় এসেছে আরও সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণের। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে “co-creation” এবং “livable city” ধারণার মাধ্যমে সরকার, বেসরকারি খাত এবং নাগরিকরা একসাথে কাজ করে একটি টেকসই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। সেখানে বয়স্ক নাগরিক, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় কমিউনিটি সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমে। বাংলাদেশেও এমন একটি অংশগ্রহণমূলক ইকোসিস্টেম তৈরি করা যেতে পারে।

এই রূপান্তরের জন্য শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রাইভেট সেক্টরের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। স্মার্ট এনার্জি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, গ্রিন ফাইন্যান্সিং এবং PPP মডেলের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ করা সম্ভব।

উপসংহার

যে কোনো কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়নের পেছনে প্রয়োজন সুসংগঠিত গবেষণা। প্রায়ই অভিযোগ ওঠে যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা কমে গেছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো—গবেষণার জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সমন্বয় ও দিকনির্দেশনা। তাই সরকারের নিয়ন্ত্রণে একটি কেন্দ্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান (Central Research Hub) গড়ে তোলা জরুরি, যা জ্বালানি, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমাধান তৈরি করতে পারবে।

অনেকে বলতে পারেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতায় এই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন। কিন্তু ইতিহাস বলছে, মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিই সবচেয়ে বড় সম্পদ। জাপান যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সীমিত সম্পদ নিয়েও গবেষণা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নয়ন সাধন করেছে। একইভাবে ভারত স্বল্প খরচে মহাকাশ গবেষণা (ISRO) পরিচালনা করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে অর্থ নয়, সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ মানবসম্পদই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ এবং গবেষকরা যথেষ্ট সক্ষম। প্রয়োজন শুধু একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে তাদের গবেষণা সরাসরি নীতি নির্ধারণে কাজে লাগানো হবে। আজ যদি আমরা গবেষণাকে গুরুত্ব দিই, তাহলে আগামী দিনের সংকট মোকাবেলায় আমরা অনেক বেশি প্রস্তুত থাকতে পারব। তাই এখনই সময়—সচেতনতা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনকে একত্রিত করে একটি টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার।

লেখক : সিনিয়র সহকারী সচিব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বর্তমানে এমবিএ অধ্যায়নরত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব জাপান

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এস আলমের প্রভাবমুক্ত ইসলামী ব্যাংকের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন

কেশবপুরে ভূমি সহকারীর বাড়িতে অজ্ঞান পার্টির হানা

একনেক সভায় ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব

পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে আনুশকার অস্বস্তি!

মণিরামপুরে নাতনীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক-১

তথ্য উপদেষ্টা / স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, থাকবে না দলীয় প্রতীক

যশোরসহ ২০ অঞ্চলে ঝড়ের সম্ভাবনা

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

কেশবপুরে শরীকানা পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

পাবনায় হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, নিহত ৩

রাজশাহীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়লো স্বর্ণের দাম

ফের বাড়ল তেলের দাম

বিশ্বকাপ ইতিহাসে পেনাল্টি গোলের রেকর্ডে লিওনেল মেসি

দেশে ফিরলেন ৪৫১৫৮ হাজি, মৃত্যু ৪৯

X