মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
জন্ম নিবন্ধন

হতদরিদ্র ও পিছিয়ে পড়াদের জন্য সেবা সহজীকরণ জরুরি

মিলন রহমান
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম
আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৩ পিএম
লেখক, শিশু সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মিলন রহমান

যশোর সদর উপজেলার মোছা. পারভীন আক্তারের (ছদ্মনাম) প্রকৃত বয়স ১৪ বছর। প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু অভিভাবকের অসচেতনতায় জন্ম নিবন্ধনে তার বর্তমান বয়স ১৬ বছর। মাধ্যমিকে ভর্তির বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ায় স্কুল থেকে বারবার তাকে জন্ম নিবন্ধনের জন্ম তারিখ সংশোধনের জন্য তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করার ক্ষেত্রে যে সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়, বিশেষ করে জন্ম তারিখ প্রমাণের সার্টিফিকেট বা টিকাকার্ড কোনো কিছুই তার নেই। অভিভাবকের অজ্ঞতায় এখন তার শিক্ষাজীবন বন্ধ হওয়ার পথে!

শুধু এই একটিই নয়; এমন ঘটনা অনেক আছে। এতো গেলো অসচেতনতার কথা। এর বাইরেও নানা কারণে অনেক শিশুই জন্মগ্রহণের পর জন্ম নিবন্ধনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অসচেতনতা ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জন্ম নিবন্ধনের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ।

এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে ফুলির (ছদ্মনাম) ঘটনাটিও। ফুলি যশোর পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ড খড়কি গাজীর বাজার এলাকার বাসিন্দা। বাবা মা এবং ফুলিসহ পরিবারের সকলেই বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। ফুলির দশ বছর বয়স পর্যন্ত কোন জন্ম নিবন্ধন ছিল না- তাই সে বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্তে¡ও কোন সরকারি সুযোগ-সুবিধা এমনকি প্রতিবন্ধী ভাতা থেকেও সে বঞ্চিত ছিল। এই অবস্থায় ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের ‘ইনহ্যান্সিং প্রোটেকশন অব চাইল্ড সেক্স ট্রাফিকিং সারভাইভরস ইন বাংলাদেশ-জে-টিপ’ প্রকল্প গাজীর বাজার এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ফুলিকে ঢাকা আহছানিয়া মিশনের ঝুঁকিপূর্ণ শিশু হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়। তারপর ফুলির জন্ম নিবন্ধনের জন্য ঢাকা আহছানিয়া মিশনের প্রচেষ্টায় যশোর পৌরসভা থেকে ফুলির জন্ম নিবন্ধন করা হয়। ফুলির জন্ম নিবন্ধন করার পরে সমাজসেবার সহযোগিতায় তাকে একটি প্রতিবন্ধী কার্ড প্রদান করা হয় এবং সে প্রতিবন্ধী কার্ডের ভাতার টাকা পায়।

এই দু’টি ঘটনা সাক্ষ্য দিচ্ছে সমাজের পিছিয়ে পড়া, হতদরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতরা জন্ম নিবন্ধনের এই প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম থেকে বেশ পিছিয়ে আছে। ফলে জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আনতে অবশ্যই বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন।

আমরা জানি, দেশের সব বয়সি নাগরিকের জন্য জন্মনিবন্ধন প্রযোজ্য। জন্মসনদ হচ্ছে একজন মানুষের জন্ম, বয়স, পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রমাণ। রাষ্ট্রস্বীকৃত নাগরিকের মর্যাদা ও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে জন্মনিবন্ধন সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। ২০০৪ সালে জন্মনিবন্ধন আইন করা হয়, কার্যকর হয় ২০০৬ সালে। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন ২০০৪ (২০০৪ সালের ২৯ নং আইন)-এর আওতায় একজন মানুষের নাম, লিঙ্গ, জন্মের তারিখ ও স্থান, বাবা-মায়ের নাম, তাদের জাতীয়তা ও স্থায়ী ঠিকানা নির্ধারিত নিবন্ধক কর্তৃক রেজিস্টারে লেখা বা কম্পিউটারে এন্ট্রি প্রদান এবং জন্মসনদ প্রদান করা হয়।

সর্বশেষ নীতিমালা অনুসারে ৪৫ দিনের ভেতরে শিশুর নতুন জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করতে কোনো ফি জমা দিতে হবে না। ৪৫ দিনের পর থেকে শিশুর ৫ বছর বয়স পর্যন্ত জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করতে ২৫ টাকা ফি এবং ৫ বছর পর জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করতে আবেদনকারীকে প্রতিটি জন্মনিবন্ধনের জন্য ৫০ টাকা প্রদান করতে হবে। এ টাকা স্থানীয় সরকার বিভাগ অথবা নিবন্ধকের কার্যালয় গ্রহণ করবে। অথচ সরকারি ফি কত, তা জানেন না অধিকাংশ গ্রাহক। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো ফি নেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ-মাসের পর মাস ঘুরতে হয় জন্মনিবন্ধন সনদ তুলতে অথবা সংশোধন করতে। অথচ জন্ম নিবন্ধন আইনে দুঃস্থ-পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী, পথে বসবাসরত শিশুদের ক্ষেতের অনুমতিপূর্বক ফিসের হার মওকুফ করার কথাও বলা আছে। কিন্তু আইনের এই ধারা প্রতিপালনের কথা শোনা যায় না।

জন্মসনদ নিয়ে বেশি ভোগান্তি হয় শিশুদের স্কুলে ভর্তির সময়। স্কুলে ভর্তির সময় শিশুর বয়স প্রমাণের জন্য জন্মসনদ চাওয়া হয়। সময়মতো জন্মনিবন্ধন পেতে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে অভিভাবকদের। শিশুর জন্মনিবন্ধন সনদ তুলতে গিয়ে দেখা যায় তাতে বাবা-মায়ের নাম ভুল রয়েছে। বাবার নামে হয়তো মোহাম্মদ আছে, কিন্তু শিশুর জন্মনিবন্ধনে মোহাম্মদ নেই। মায়ের নামে আক্তার থাকলেও শিশুর জন্মনিবন্ধনে মায়ের নামের ঘরে বেগম লিপিবদ্ধ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পিতামাতার জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে নামের মিল নেই জাতীয় পরিচয়পত্রের। এক্ষেত্রে শিশুর জন্মনিবন্ধন করতে প্রথম ধাপে সংশোধন করতে হয় পিতামাতার নাম। ভোগান্তিটা এখান থেকেই শুরু হয়। অন্যদিকে শিশুর পিতা প্রবাসে থাকায় পাসপোর্টের নামের সঙ্গে অনেকের মিলছে না জন্মনিবন্ধনের নাম। এতে অভিভাবকদের আরেক ধাপ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দেশে ফিরে নতুন করে পাসপোর্ট করাতে গেলে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে ত্রিমুখী ভুল থাকায় ভোগান্তি আরও বাড়ছে।

এদিকে জন্মনিবন্ধন সনদ নিতে আসা অধিকাংশ নাগরিকের অভিযোগ, প্রায়ই সার্ভার ডাউন থাকে। সার্ভার ঠিকমতো কাজ করতে না পারায় জন্মনিবন্ধন সনদ নিতে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, অতিরিক্ত ফি আদায় করতে ইন্টারনেটের গতি কম, সার্ভার ডাউন প্রভৃতি অজুহাত দেখিয়ে সেবাপ্রার্থীদের দিনের পর দিন ঘোরানো হয়।

অথচ জন্ম নিবন্ধন আইনে আছে, ‘নিবন্ধক জন্ম নিবন্ধন তথ্য ব্যবস্থায় এবং প্রযুক্তিগত কারণে কোন নিবন্ধকের কার্যালয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্যব্যবস্থা বা তথ্যব্যবস্থা পুনঃস্থাপন না হওয়া পর্যন্ত নিবন্ধন বহিতে জন্ম বা মৃত্যুর তথ্য সংরক্ষণ করিবেন। পরবর্তীতে নিবন্ধন তথ্য ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্য স্থাপন করা হবে।’ অর্থাৎ ইন্টারনেটগত জটিলতা থাকলেও জন্ম নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই সুবিধাও দিতে সংশ্লিষ্টরা খুব একটা আগ্রহী হন না।

এছাড়াও হতদরিদ্র বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠাকে আরও একটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে। সেটি স্থায়ী ঠিকানা বা অপ্রাপ্য তথ্যের (কখনও কখনও বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ঘাটতি) ক্ষেত্রে। সে ক্ষেত্রেও কিন্তু আইনে সুযোগ দেওয়া রয়েছে। আইন অনুযায়ী, ‘কোন কারণে কোন ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা না থাকিলে স্থায়ী ঠিকানার স্থানে অপ্রাপ্য লিখিয়া কেবলমাত্র বর্তমান ঠিকানা উল্লেখপূর্বক জন্মস্থানের নিবন্ধকের নিকট জন্ম নিবন্ধন করিতে হইবে এবং এই ক্ষেত্রে আইনের ধারা ৯ এর উপ-ধারা (১) এর অধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীগণের এই মর্মে প্রত্যয়ন করিতে হইবে যে, উক্ত ব্যক্তির কোন স্থায়ী ঠিকানা নাই।’ এছাড়া অন্য অপ্রাপ্ত তথ্যের ক্ষেত্রেও আইনে সুযোগ দেওয়া রয়েছে। কিন্তু দেখা যায়, দায়িত্বশীলরা অনেকে ঝামেলা এড়াতে এসব বিষয়ে সেবাবান্ধব আচরণ করেন না।

পরিশেষে বলা যায়, প্রত্যেকটা শিশুর জন্মের সাথে সাথে তার জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করা সকলের দায়িত্ব। তাই জন্ম নিবন্ধনের ব্যাপারে নাগরিকদের যেমন সচেতন করা প্রয়োজন, তেমনি প্রক্রিয়াকে সহজতর করা দরকার। বিশেষ করে সমাজের হতদরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীকে এই প্রক্রিয়ায় আরও বেশি সংযুক্ত করা সম্ভব না হলে এর সুফল পুরোপুরি অর্জন দুরূহ হয়ে পড়বে।

লেখক : শিশু সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

একনেক সভায় ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব

পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে আনুশকার অস্বস্তি!

মণিরামপুরে নাতনীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক-১

তথ্য উপদেষ্টা / স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, থাকবে না দলীয় প্রতীক

যশোরসহ ২০ অঞ্চলে ঝড়ের সম্ভাবনা

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

কেশবপুরে শরীকানা পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

পাবনায় হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, নিহত ৩

রাজশাহীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়লো স্বর্ণের দাম

ফের বাড়ল তেলের দাম

বিশ্বকাপ ইতিহাসে পেনাল্টি গোলের রেকর্ডে লিওনেল মেসি

দেশে ফিরলেন ৪৫১৫৮ হাজি, মৃত্যু ৪৯

নওগাঁয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ সুপারের সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা

যশোরে স্ত্রী হত্যায় স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা, চাকু উদ্ধার

X