
কবি আবুল হাসানের একটি কবিতার লাইন মনে পড়ে, “অতটুকু চায়নি বালিকা! অত শোভা, অত স্বাধীনতা! চেয়েছিল আরো কিছু কম,” আমাদের এই অভাগী দেশমাতৃকাও বোধ হয় এতকিছু চায়নি। চাওয়া ছিল এর কিছু কম। স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে নিজের মাটিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। সাধারণ মানুষ কর্মব্যস্ত দিন শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরে আত্মীয় পরিজনের সাথে নির্বিঘ্নে সময় কাটাবে। নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবে। ছেলেমেয়েরা সাবলীল ভঙ্গিতে লেখাপড়া করবে, খেলাধুলা করবে। শিক্ষিত জাতি হিসেবে আমাদের সন্তানরা দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে। অত বিবর্তিত শোভা, স্বাধীনতার এমন বিক্ষুব্ধ প্রকাশ, সামনে এগোনোর পরিবর্তে ইতিহাস ঐতিহ্য, সংস্কৃতির শেকড়ের মূলোৎপাটন নিশ্চয়ই চায়নি। চায়তে পারে না ঐতিহ্যবাহী কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠী। চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল কখনো হয় না। তাই দেশের চাহিদার চেয়ে প্রাপ্তির পরিমান বেশি হওয়ায় তা এখন উদরাময়ে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকের চেয়ে ছাত্র বেশি শিখে ফেলেছে, পুলিশের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনে নতুন প্রজন্ম বেশি পারদর্শী, সেনাবাহিনীর চেয়ে নব্য রাজনীতিকরা বেশি শক্তিশালী, ধার্মিকের চেয়ে অতিধার্মিকের আস্ফালন বেশি, সত্যের চেয়ে মিথ্যার জমিন উর্বরতা বেশি, ফলনও মাশাল্লাহ সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে ফেলেছে। খবরের চেয়ে খবরদারের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় সেই উৎপাদিত ফলন এই উদরাময়ের বায়ুপ্রবাহ মস্তিষ্কের দেয়ালকে উত্তপ্ত করে তুলছে। ফলে চারদিকের উত্তপ্ত চিন্তাশক্তির কম্পনে সাধারণ নির্জীব মানুষেরা সদা কম্পমান। দেশে এতবড় একটা রক্তক্ষয়ী পরিবর্তন হয়ে গেল, সেই পরিবর্তনে নারীর ভূমিকা বা অবদান কোনো অংশে কম নয়। থাকার কথাও নয়, কারণ নারীশিক্ষার হার বেড়েছে। নারীর কথা বলার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর জন্য কর্মক্ষেত্র বেড়েছে। তারা এই আন্দোলনে ভূমিকা রাখতে সন্তানকে যেমন উৎসাহিত করেছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাও রাস্তায় নেমে তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করেছে। কিন্তু দিন শেষে দেখা গেল সেই নারীর কাপড় নিয়ে টানাটানি হয়েছে সবার আগে। যেখানে যার যত অবদানই থাক তার দেহসৌষ্ঠব ছিন্নভিন্ন করে টেবিলে উপস্থাপন হবেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে এটা একটা। নারী ঘর সামলাবে, সন্তান উৎপাদন করবে, লেখাপড়া শিখবে, রোজগার করবে আবার আন্দোলন সংগ্রামেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করবে। অথচ একটু এদিক ওদিক হলেই তাকে জনসমক্ষে হেনস্তার শিকার হতে হবে। হয়রানি, অসম্মান, খুন, ধর্ষণের মতো জুলুমে নারীকে পড়তে হবে এবং বিচারহীনতার চক্করে নিরন্তর ঘুরপাক খেতে হবে।
মন্তব্য করুন