
বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও সাম্যের প্রতীক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। বিদ্রোহ, মানবতা, প্রেম ও সম্প্রীতির এই কবিকে স্মরণ করতে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত পরিবেশনা এবং স্মরণানুষ্ঠান।
এবারের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারিভাবেও নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রিশাল-এ। কবির স্মৃতিবিজড়িত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক আয়োজন, আলোচনা সভা এবং নজরুলসংগীত পরিবেশনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছেন। এর মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে নজরুল চর্চা ও তার সাহিত্যকর্মকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ জোরদার করা হচ্ছে।
যে কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্র হয়ে উঠেছিল, সেই কলমই আবার লিখেছিল প্রেম, সাম্য ও মানবতার গান। নজরুল শুধু একজন কবি ছিলেন না, ছিলেন সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া এক সাহসী কণ্ঠ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন।
‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই’—এই দর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। নিজের সন্তানদের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ ও অরিন্দম খালেদ। তার লেখায় যেমন ছিল কোরআনের বাণী, তেমনি উঠে এসেছে শ্যামা, কালী ও কৃষ্ণভক্তির গানও।
নজরুলের গান, কবিতা ও প্রবন্ধে উঠে এসেছে বঞ্চিত মানুষের কথা। নারীর অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট এবং শোষণের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে এক নতুন দিক।
মাত্র ৪৩ বছরের সাহিত্য জীবনে কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ মিলিয়ে দুই হাজারেরও বেশি গান এবং অসংখ্য সাহিত্যকর্ম উপহার দিয়েছেন তিনি। ‘বিদ্রোহী’, অগ্নিবীণা, সাম্যবাদী ও দোলনচাঁপা-র মতো সৃষ্টিগুলো আজও বাংলা সাহিত্যের অনন্য সম্পদ।
মানুষে মানুষে বিভেদের দেয়াল ভাঙার স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই মৃত্যুর পরও মানুষের কাছেই থাকতে চেয়েছিলেন জাতীয় কবি। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই সমাহিত করা হয় তাকে। প্রতিদিন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ চেয়ারম্যান প্রিয়াংকা গোপ বলেন, “এত অল্প সময়ে এতগুলো জায়গায় কী করে বিচরণ করে! এটা আসলে আমার কাছে রহস্য মনে হয়।”
অন্যদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট-এর নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম শিবলী বলেন, “আমাদের এখন লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বব্যাপী নজরুলকে ছড়িয়ে দেওয়া। সম্প্রতি আমরা নজরুল সাহিত্যকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছি। যত বেশি বিদেশি ভাষায় অনুবাদ হবে, তত বেশি নজরুল বিশ্বের হয়ে উঠবে।”
নজরুল শুধু সাহিত্যিক ছিলেন না, ছিলেন সম্প্রীতি ও মানবতার এক জীবন্ত প্রতীক। তাই তাকে শুধু স্মরণ করলেই হবে না, প্রয়োজন তার আদর্শকে ধারণ করা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে নজরুল চর্চা আরও বিস্তৃত করা।
মন্তব্য করুন