
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর একটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন থাকলেও রুশ কর্তৃপক্ষ বলছে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই কেন্দ্রের বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তাদের দাবি, তৃতীয় প্রজন্মের এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ১০ লাখ বছরে একবার ঘটতে পারে।
রুশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য নিরাপত্তা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আধুনিক নিউক্লিয়ার প্রযুক্তির কারণে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ কোনো ত্রুটি বা বিচ্যুতি ঘটলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ অংশ দ্রুত সিলগালা হয়ে যায়, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসে কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা মানুষের মনে এখনো আতঙ্ক তৈরি করে। ২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির আঘাতে কেন্দ্রটির রিঅ্যাক্টরে বিস্ফোরণ ঘটে।
এর আগে ইউক্রেনের চেরনোবিল দুর্ঘটনা, যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইল আইল্যান্ড দুর্ঘটনা এবং এসএল-ওয়ান দুর্ঘটনাও পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ তৈরি করেছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে বর্তমান প্রজন্মের প্ল্যান্টগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ।
রূপপুর প্রকল্প এলাকার অনেক বাসিন্দার মধ্যেই এখনো উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে কিংবা কতদূর পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে—এসব বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৭২ বছরের ইতিহাসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা হয়েছে চারটি।
দিন বদলেছে, পারমাণবিক প্রযুক্তিও এগিয়েছে। বর্তমানে কোনো অভ্যন্তরীণ ত্রুটি বা বিচ্যুতি ঘটলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেটি ভেতরেই সিলগালা হয়ে যায়। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমেছে। রূপপুরের মতো তৃতীয় প্রজন্মের প্ল্যান্টে ঝুঁকির সম্ভাব্যতা যাচাই করে রুশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দাবি, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা ১০ লাখ বছরে একবার।
তবুও মানুষের মধ্যে ভীতি রয়ে গেছে। স্থানীয় একজন বলেন, আমরা খুবই শঙ্কার মধ্যে আছি। যদি কখনো কোনো সমস্যা হয়, তাহলে আমরা কীভাবে নিরাপদ থাকব? আরেকজন বলেন, কোনো দুর্ঘটনা হলে কতদূর পর্যন্ত সমস্যা হতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কিছু জানানো হয়নি।
বসে নেই কর্তৃপক্ষও। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে মাটির গভীরে একটি নিরাপত্তা কক্ষ বা ইভাকুয়েশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রকল্পের আড়াই হাজার কর্মী অন্তত তিন দিন নিরাপদে থাকতে পারবেন। আরেকটি রয়েছে মূল কেন্দ্রের বাইরে, গ্রিন সিটিতে, যেখান থেকে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, যখন রিঅ্যাক্টর পুরোপুরি অপারেশনে থাকবে, তখন এখান থেকে আমরা টেম্পারেচার, প্রেসার, কোন ভাল্ব ওপেন বা ক্লোজ সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করতে পারব।
যেকোনো পরিস্থিতিতে মানুষকে নির্দেশনা জানাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারপাশের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে ৬৪টি সাইরেন টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন বলেন, আল্লাহ না করুন যদি এ ধরনের কোনো জরুরি ঘটনা ঘটে, তাহলে এটি শুধু প্ল্যান্টের বিষয় থাকবে না, জাতীয় জরুরি অবস্থায় পরিণত হবে। তখন সরকার আমাদের সঙ্গে থাকবে।
মন্তব্য করুন