
বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে আরও বেগবান করার লক্ষ্য নিয়ে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত দুই দিন ব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’ শেষ হয়েছে। দেশ-বিদেশের সাংবাদিক, সম্পাদক, গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এ আয়োজনে বক্তাদের আলোচনায় উঠে এসেছে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের মধ্যেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ, ডাটা জার্নালিজম এবং পেশাগত সততা বজায় রাখার ওপরও দেওয়া হয়েছে দুই দিনের এই আয়োজনে বেশ কয়েকটি প্লেনারি সেশন, মাস্টারক্লাস ও ডিসকাশন। সমাপনী দিনে বক্তারা বলেন, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অভাব, ব্যবসা ও রাজনীতির যোগসাজশ এবং নানামুখী চাপের কারণে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। এই সংকট উত্তরণে রাজনৈতিক সহনশীলতা, অংশীজনদের নিরাপত্তা এবং সংবাদমাধ্যমের নিজেদের আত্মসমালোচনা জরুরি। ‘মিডিয়া সেলফ রেগুলেশন ইন বাংলাদেশ: প্রফেশনাল ওভারসাইট, অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড গ্রিভেন্স রেডরেসাল’ শীর্ষক সেশনে এক ব্যতিক্রমী ও অকপট স্বীকারোক্তি দেন টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে আজাদ। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম মালিক হওয়ায় জনগণ কেন তার সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন ভাববে-এমন প্রশ্নের জবাবে এ কে আজাদ বলেন: “আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তারা (সাংবাদিক) স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। কেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না? তার মূল অন্তরায় হচ্ছি আমি।” নিজের সীমাবদ্ধতার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে ৭৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। তাদের স্বার্থরক্ষা করা তার প্রথম অগ্রাধিকার। ফলে সৎ সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা তার কাছে দ্বিতীয় বিষয় হয়ে দাড়ায়।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে চাপের বর্ণনা দিয়ে এ কে আজাদ বলেন, কোনো দুর্নীতির খবর প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিতে গেলেই চাপ শুরু হয়। সরাসরি কাজ না হলে প্রভাবশালী মহল, গোয়েন্দা সংস্থা বা সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের দিয়ে ফোন করানো হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে সরকারি বা রাজনৈতিক হয়রানি ও গ্রেপ্তার না হওয়ার নিশ্চয়তা দাবি করেন। এই সেশনে আরও বক্তব্য দেন ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আইন বিশেষজ্ঞ জন বারাটা ও প্রথম আলোর ইংরেজি বিভাগের প্রধান আয়েশা কবির। সেশনটি পরিচালনা করেন বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার। এর আগে সকালে অনুষ্ঠিত ‘পলিটিকো-গভর্ন্যান্স ইকোসিস্টেম অ্যান্ড ফ্রি মিডিয়া’ শীর্ষক সেশনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘জিরো সাম গেম’ (হার-জিতের খেলা) সংস্কৃতি চালু রয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ, ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্যপ্রবাহ সীমিত করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গত দুই দশকে রাষ্ট্রীয় ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোর নজিরবিহীন রাজনীতিকরণ হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর আইনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ আইনে শত শত সাংবাদিককে শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে হয়রানি করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিশোধের মানসিকতা বহাল থাকলে প্রকৃত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা কঠিন।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘ডন’-এর সম্পাদক জাফর আব্বাস তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত-সব দেশের গণমাধ্যমই এখন একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ক্ষমতার লড়াই বা নগরকেন্দ্রিক অপরাধ সংবাদে প্রাধান্য পেলেও সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের কথা আড়ালে থেকে যায়। পশ্চিমা দেশের (যেমন সুইডেন বা নরওয়ে) সাথে তুলনা না করে এই অঞ্চলের নিজস্ব বাস্তবতা বিবেচনা করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুশাসনের পথ খোঁজার আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে সাংবাদিকদের নিজেদের ভুলত্রুটি নিয়ে আত্মসমালোচনা করার তাগিদ দেন, যা সমাজ ও সরকারের ওপর ইতিবাচক চাপ তৈরি করবে।
ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, রাষ্ট্রে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক চর্চা অনুপস্থিত থাকলে সংবাদমাধ্যমও স্বাধীন থাকতে পারে না। দীর্ঘ শাসনব্যবস্থার অবসানের পর দেশে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সেশনটি সঞ্চালনা করেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন। এতে আরও আলোচনা করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। সমাপনি সেশনে এমআরডিআই-এর পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে একটি ফ্রি অনলাইন ডাটা জার্নালিজম কোর্স চালু করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এছাড়াও আগামীতে এ ধরনের কনফারেন্স আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এমআরডিআই এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুর।
মন্তব্য করুন