
বাংলাদেশে এই প্রথম বৃহৎ আকারে উদ্বোধন হলো বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স। রাজধানীর রেডিসান বুলু হোটেলে শুক্রবার এই আয়োজন করে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)।
প্রতিষ্ঠানটির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুদিন ব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সম্মেলনের প্রথম পর্বে দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম বলেন, অতীতের সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ ছিল স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম বিকশিত হতে না দেওয়া। কারণ, স্বাধীন গণমাধ্যম প্রশ্ন তুলেছে, তাদের দায়বদ্ধতা যাচাই করেছে, তাদের অনিয়ম প্রকাশ করেছে। তবে নতুন সরকার অতীত থেকে শিখবে বলে আশা প্রকাশ করেন ডেইলি স্টার সম্পাদক।
তিনি বলেন, নতুন সরকার এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শিখবে যে তাদের প্রয়োজনেই স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রয়োজন। তাদের সাফল্যের জন্যই স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রয়োজন। অনুসন্ধানের বদলে মুনাফার দিকে ঝুঁকলে সাংবাদিকতার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে বলেন মনে করেন পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস। প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ‘সেলফ-সেন্সর’ অনেক বেশি বিপজ্জনক উল্লেখ তিনি বলেন, প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকলে জনগণের সামনে বলা যায় যে সামরিক শাসন বা কর্তৃত্ববাদী শাসকের কারণে কিছু প্রকাশ করা যাচ্ছে না। কিন্তু ‘সেলফ-সেন্সর’-এর ক্ষেত্রে জনগণকে এটুকুও বলার উপায় থাকে না যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন আছে, অথচ প্রকাশ করা হচ্ছে না। এই অদৃশ্য চাপই সবচেয়ে কঠিন সমস্যা।
কানাডার সংবাদ মাধ্যম টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই একমাত্র উপাদান, যা একটি সংবাদ সংস্থাকে অন্যটি থেকে আলাদা করে। সাংবাদিকদের হয়রানি থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থাপক ও মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মইকেল কুক বলেন, গণতন্ত্রের রক্ষক প্রয়োজন, আর অনুসন্ধানী প্রতিবেদক এবং সম্পাদকরা সেই লড়াইয়ের সম্মুখসারিতে বীরত্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশের কয়েকটি গণমাধ্যমের ওপর প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে হামলার আগাম ঘোষণা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। গণমাধ্যমে হামলার এই নজির বিশ্বে বিরল। প্রথম দিনের সমাপনী পর্বে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, নিউ মিডিয়া বা নতুন মাধ্যম এখন গোটা গণমাধ্যম জগতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিবর্তনকে বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা ছিল গণমাধ্যমকে সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সরকারও নতুনভাবে বিষয়গুলো দেখার ও বোঝার চেষ্টা করছে। গণমাধ্যম যাতে সঠিকভাবে তথ্য পায় এবং জনগণের কাছে তা পৌঁছে দিতে পারে, সে জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রথম আলোর কনসালটেন্ট কুররাতুল আইন তাহমিনা, বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার ও দ্য ডেইলি স্টারের ডিজিটাল এডিটর তানিম আহমেদ প্রথম দিনের বিভিন্ন অধিবেশন সঞ্চালনা করেন। বার্তাকক্ষে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি বিষয়ক অধিবেশনে কুররাতুল আইন তাহমিনা বলেন, সাংবাদিকতার আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য পূরণ করতে হলে অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্রের দিকে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। সংবাদমাধ্যমে বদল আনতে হলে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক, তথ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক জুলিয়ান শের একটি অধিবেশনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। আলোচকেরা বলেন, বাংলাদেশের অনেক সংবাদমাধ্যমে এখনো নারী, আঞ্চলিক এবং সংখ্যালঘু পটভূমির সাংবাদিকদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা বড় একটি চ্যালেঞ্জ। নিয়োগ থেকে শুরু করে নেতৃত্বের পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব, মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিংয়ে নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি বা বৈষম্যের অভিজ্ঞতা—এসব বিষয় নারী সাংবাদিকদের পেশাগত অগ্রযাত্রায় প্রভাব ফেলে। আয়োজকেরা জানান, নতুন গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে দায়িত্বশীল ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার চর্চা জোরদার করাই এ সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করবে এই আয়োজন।
সম্মেলনে প্রথম দিনের বিভিন্ন অধিবেশনে আলোচনায় আরও অংশ নেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মোহাম্মদ আলী, ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট এডিটর স্বাতী ভট্টাচার্য, বাংলাদেশে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস, ইউনেস্কো প্রতিনিধি সুসান ভায়েজ, গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের (জিআইজেএন) নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক, যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ, এমআরডিআই নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান ও হেড অব ক্যাপাসিটি বিল্ডিং বদরুদ্দোজা বাবু, দ্য ডেইলি স্টারের সিনিয়র রিপোর্টার জায়মা ইসলামসহ দেশ-বিদেশের সংশ্লিষ্ট খাতের বিশিষ্টজনেরা।
মন্তব্য করুন