
রাজধানীর শাহবাগ থানার সামনে ২৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।এ নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে। এ ঘটনার পর থেকেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে।
হামলার শিকার এ বি জুবায়ের ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবং মুসাদ্দিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত রয়েছেন। গত বছর ডাকসু নির্বাচনে তারা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমর্থন নিয়ে জয়লাভ করেছিলেন। ঘটনার সময় হামলার মুখে তারা শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে আশ্রয় নেন। প্রায় এক ঘণ্টা সেখানে অবরুদ্ধ থাকার পর পুলিশের সহায়তায় থানার জামে মসজিদের ফটক দিয়ে তাদের বের করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ দাবি করেছেন যে, ছাত্রদলের কর্মীরা বহিরাগতদের সাথে নিয়ে তাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ পোস্টের বিষয়টি নিয়ে তারা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়েছিলেন। এ সময় তাদের বাধার মুখে পড়তে হয় এবং হামলার শিকার হতে হয়।
অন্যদিকে, এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ভিন্ন দাবি করেছেন। তিনি জানান, বিতর্কিত পোস্টের বিষয়ে ডাকসু নেতারা থানায় উপস্থিত হলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং মারধরের চেষ্টা করে। তার দাবি, সেই পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনসহ অন্যরা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে তাদের রক্ষার চেষ্টা করেছেন।
মূলত প্রধানমন্ত্রী ও তার কন্যাকে নিয়ে ইন্টারনেটে ছড়ানো একটি বিতর্কিত পোস্ট ও ফটোকার্ডকে কেন্দ্র করেই এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পোস্টটি নিয়ে দিনভর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দোষারোপের রাজনীতি চলছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাত পৌনে ৯টার দিকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম শাহবাগ থানায় উপস্থিত হন। শেষ পর্যন্ত পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম ও ছাত্রদল নেতাদের সহায়তায় ডাকসু নেতাদের সেখান থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।
রাজধানীর শাহবাগ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় পরিণত হয় এক উত্তপ্ত সংঘর্ষময় এলাকায়, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নেতাদের ওপর হামলার ঘটনাকে ঘিরে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরা শাহবাগ থানা-র ভেতরেও হামলার অভিযোগ ওঠায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। হামলার শিকার হন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের ও সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। উত্তেজনার মধ্যে তারা থানার ভেতরে আশ্রয় নিলেও সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকেন। পরে পুলিশের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ নেওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত একটি বিতর্কিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টকে কেন্দ্র করে, যা দিনভর ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। বিকেলে দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, যা দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়।
উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ তুলেছে। ছাত্রশিবিরের দাবি, থানায় জিডি করতে গেলে ছাত্রদল বহিরাগতদের নিয়ে হামলা চালায়। বিপরীতে ছাত্রদলের দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা বরং ডাকসু নেতাদের রক্ষার চেষ্টা করেছে।
ঘটনার পর এলাকায় বিক্ষোভ, মিছিল ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাতে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও এই ঘটনা ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন করে সহিংসতার শঙ্কা উসকে দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু তাৎক্ষণিক সংঘর্ষ নয়—বরং ছাত্ররাজনীতিতে সহিংসতার পুরোনো সংস্কৃতির পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা পরিবেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
এদিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শাহবাগ থানায় ঢুকে মব করেছে এবং পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা নিয়েছে, এগুলো সবই ফ্যাসিবাদী আচরণের লক্ষণ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল শেষে তিনি এসব মন্তব্য করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমর্থনে ছাত্রদল শাহবাগ থানায় চড়াও হয়েছে কি না সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এ সময় ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, থানায় হামলা চালিয়ে ইতিহাসের ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছে ছাত্রদল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশী শক্তির রাজনীতি মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি করেন তিনি।
অপরদিকে হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (মোনামী)। বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই সহিংসতার তীব্র সমালোচনা করেন এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন।
পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে একসময় লীগের ব্যবহৃত সেই পুরোনো ও কুৎসিত বয়ান আবারও ফিরে আসছে। তিনি মনে করেন, এই ধরনের ন্যারেটিভ তৈরির মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতিকে নতুন করে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সরকার ও ছাত্রদলের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসে তিনি দেশব্যাপী অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য ছাত্রদলকে দায়ী করেছেন।
সাদিক কায়েম তার স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার যখন জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, কূটনৈতিক দুর্বলতা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তখন সেই ব্যর্থতা আড়াল করতেই তারা ছাত্রদলের লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ক্যাম্পাসে রামদা ও চাপাতি নিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হচ্ছে এবং ভুয়া স্ক্রিনশট ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার ও হত্যাচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
মন্তব্য করুন