মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সারাদেশে বাড়ছে লোডশেডিং : বেশি ভোগান্তিতে গ্রামাঞ্চল

কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৪ এএম
সারাদেশে বাড়ছে লোডশেডিং

সারাদেশজুড়ে আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে বিদ্যুৎ সংকট। বিশেষ করে গ্রাম ও পৌর এলাকার বাইরে বসবাসকারী মানুষরা সবচেয়ে বেশি লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনে-রাতে মিলিয়ে ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।

এপ্রিলের শুরুতে আবহাওয়া তুলনামূলক সহনীয় থাকলেও মাঝামাঝি সময় থেকে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছানোয় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়টাতে প্রতি বছরই বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই তিন মাস দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সংকট তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় রোধে অফিসের সময় কমানো, শপিং মল দ্রুত বন্ধ করাসহ নানা প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার। কিন্তু লোডশেডিং পরিস্থিতির কারণে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেসব ব্যবস্থা কতটা কাজে লাগছে।

যদিও এই সংকট কাটাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কিছুটা কমছে। সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করে দ্রুত পুরোদমে উৎপাদন শুরুর চেষ্টা করছে সরকার।

শহরের বাইরে বেশি লোডশেডিং এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে গরম ছিল তুলনামূলক কম। গত রোববারের পর থেকে আস্তে আস্তে গরম বাড়তে শুরু করেছে সারাদেশে।

মেহেরপুরের আমঝুপির ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান লিটন জানান, রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ৪-৫ বার বিদ্যুৎ যায়। অনেক সময় দিনে-রাতে অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না।

লিটন জানান, তিনি যে এলাকায় থাকেন সেটি শহর বা পৌরসভার বাইরে। পৌরসভার বাইরের বিদ্যুৎ সরবারহ করে থাকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। আর শহরের বাইরেই এই লোডশেডিং সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চারবার লোডশেডিং হয়েছে। প্রত্যেকবারই এক থেকে দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিং হয়। প্রচণ্ড গরম, ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রা। কারেন্ট গেলে বাসার বাইরে বের হতে হয়। হাতপাখা দিয়ে বাতাস করা ছাড়া আর উপায় নেই।

পৌর এলাকার বাইরে লোডশেডিং পরিস্থিতি বেশি খারাপ হলেও শহরের মধ্যে তুলনামূলক লোডশেডিং কম বলে জানান মেহেরপুর শহর এলাকার বাসিন্দা রাশেদুজ্জামান।

তিনি জানান, তাদের পৌর এলাকায় সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনবার বিদ্যুৎ যায়, যেটি গ্রামের তুলনায় অনেক কম।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মেহেরপুর জোনের জেনারেল ম্যানেজার স্বদেশ কুমার ঘোষও এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের টোটাল যে ডিমান্ড আছে তার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। আমরাও বিদ্যুৎ কম পাচ্ছি, সে জন্য লোডশেডিং হচ্ছে।

তার হিসাব অনুযায়ীই, গত দুই দিনে গড়ে ছয় থেকে আট ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না পৌর এলাকার বাইরে।

লালমনিরহাট থেকে ফারাহ ফিবা নামে একজন গৃহিণী জানান, তিনি যে এলাকায় থাকেন সেটি পৌরসভার মধ্যে। পৌর এলাকায় থাকায় দিনে দুই তিনবার, কিংবা কখনো তারও কম লোডশেডিং হচ্ছে। তবে শহরের বাইরে তার পরিচিত যারা আছেন তাদের অভিযোগ লোডশেডিং বাড়ছে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার হেমসেন লেন এলাকার একজন বাসিন্দা জানান, গত কয়েকদিন ধরেই বার বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকাল নাগাদ অন্তত চার বার লোডশেডিং হয়েছে।

ময়মনসিংহের স্থানীয় সাংবাদিক আতাউর রহমান জুয়েল জানান, সম্প্রতি বিভাগের সব জেলাতেই লোডশেডিং বেড়েছে বলে অভিযোগ আসছে। বিভাগের ছয় জেলায় দিনে গড়ে ১০৭৫ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩২৫ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুতের ঘাটতি হচ্ছে বলে পিডিবি সূত্রের বরাত দিয়ে জানান তিনি।

পরিস্থিতি আসলে কেমন? পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ বা পিজিসিবি এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বা পিডিবির গত কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পিক আওয়ারে (সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) সারাদেশে লোডশেডিং এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

পিডিবির গত কয়েক দিনের তথ্য বলছে, এই মাসের প্রথমার্ধে দেশে দিনে ও রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।

গত ১৪ এপ্রিল (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সারাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৪ হাজার ৮০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। সেই হিসেবে এই সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৬৮৮ মেগাওয়াট।

পরদিন অর্থাৎ বুধবার বিকেল তিনটায় সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে এই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৬৭০ মেগাওয়াট। পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে সারাদেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৮৪৩ মেগাওয়াট।

গত কয়েক সপ্তাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বুধবারের এই লোডশেডিংয়ের পরিমাণ চলতি মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, গত কয়েকদিনে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কিছু মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। তাছাড়া জ্বালানি সংকটও রয়েছে। যে কারণে চাহিদা থাকলে সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

পিজিসিবির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে সারাদেশের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। সেটা গরম বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে শুরু করেছে।

এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ অর্থাৎ আট এপ্রিলের পর থেকে সেটি আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করে। প্রথম সপ্তাহে খুব সামান্য লোডশেডিং থাকলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে সেটি বেড়ে গড়ে ৭০০-৯০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। আর ১৫ এপ্রিল থেকে সেটি বেড়ে ১৮০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বেড়েছে।

এবার আশঙ্কা আরও বেশি পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আমদানিসহ) রয়েছে। এগুলোর সর্বমোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট।

পিডিবির ওয়েবসাইট বলছে, এর বিপরীতে প্রতিদিন দিন গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাকি অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সময়ের বকেয়া পরিশোধ, জ্বালানি তেলের সংকটসহ নানা কারণে এবার গরমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশ খারাপের দিকে যেতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন। সেটির একটি সংকট আছে। এছাড়াও গ্যাসসহ জ্বালানি সংকট রয়ছে। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

গত এক মাসের তথ্যে দেখা গেছে, দিনের বেলার তুলনায় সন্ধ্যা বা রাতের পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি। যে কারণে দিনের তুলনায় রাতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও বেশি।

সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ১৫ই এপ্রিল বিকেল তিনটায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৩ হাজার ১১২ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধের কারণে কয়লা ও তেলের সাপ্লাই চেইনে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে কয়লার জন্য আমাদের দুইটা মেশিন আন্ডার লোডে চলতেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেটি আর থাকবে না।

তিনি বলছিলেন, অন্যদিকে গ্যাস সংকটের কারণেও উৎপাদন কমছে। সেটি আরেকটু বাড়ানো গেলে লোডশেডিং আরো কমানো যেতো।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমের আশঙ্কা, এবার যদি গরম বাড়ে, তাহলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেক বেশি খারাপের দিকে যেতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

কেশবপুরে শরীকানা পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

পাবনায় হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, নিহত ৩

রাজশাহীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়লো স্বর্ণের দাম

ফের বাড়ল তেলের দাম

বিশ্বকাপ ইতিহাসে পেনাল্টি গোলের রেকর্ডে লিওনেল মেসি

দেশে ফিরলেন ৪৫১৫৮ হাজি, মৃত্যু ৪৯

নওগাঁয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ সুপারের সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা

যশোরে স্ত্রী হত্যায় স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা, চাকু উদ্ধার

কালীগঞ্জে সর্বত্র মাদকের রমরমা ব্যবসা / হুমকির মুখে যুবসমাজ, আতঙ্কে অভিভাবকরা

২০২৬-২৭ বাজেট: যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে

দেশের ১৪ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস

নড়াইলে ইয়াবাসহ যুবক গ্রেফতার, ২ মাসের কারাদণ্ড

স্ত্রীকে তালাক দিয়ে শাশুড়িকে বিয়ে!

আদিতমারীতে তুচ্ছ বিরোধের জেরে সংঘর্ষ, কিশোর নিহত

X