
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বড় মানবপাচার চক্রের সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, সিভিল এভিয়েশন, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত এই সিন্ডিকেটে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন জড়িত।
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরে কর্মরত কিছু সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা ‘বডি কন্ট্রাক্ট’-এর নামে অর্থের বিনিময়ে যাত্রীদের অবৈধভাবে বিদেশে পাঠিয়ে আসছিলেন। উন্নত জীবনের আশায় যাওয়া এসব মানুষ অনেক সময় ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়ছেন কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, কেউ অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মুক্তিপণ দিয়ে দেশে ফিরছেন।
সম্প্রতি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে ২১ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর সরকার বিষয়টিতে কঠোর অবস্থান নেয়। এরপর বিমানবন্দরকেন্দ্রিক মানবপাচার নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু হয়, যাতে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, অনেক ক্ষেত্রে বিদেশগামীদের প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও ‘বডি কন্ট্রাক্ট’-এর মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে তাদের ফ্লাইটে উঠিয়ে দেওয়া হতো। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় বিস্তারিত তদন্ত।
তিনি আরও জানান, অনুসন্ধানে একাধিক সরকারি কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে সিভিল এভিয়েশন, এসবি এবং বাংলাদেশ বিমানসহ বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে এখনো সংশ্লিষ্টদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
সূত্র মতে, এই সিন্ডিকেটে সিভিল এভিয়েশনের অন্তত ১০ জন, এসবির ১০-১২ জন এবং বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের আরও ১০-১২ জন প্রতিনিধি জড়িত। তারা প্রতিজনের কাছ থেকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে অবৈধভাবে বিদেশগমনের ব্যবস্থা করতেন।
ইতোমধ্যে জড়িতদের নামসহ একটি তালিকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে মানবপাচার প্রতিরোধে বিমানবন্দর এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে একাধিক সংস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছে।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ জানান, মানবপাচার প্রতিরোধে নিয়মিত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ বিষয়ে বিশেষ তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে কারা এই চক্রে জড়িত, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ বা জাল ভিসার মাধ্যমে যাত্রী পাচার হলেও ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় না জানায় তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে এই অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
মন্তব্য করুন