
গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের স্পর্শকাতর ইস্যু আবারও সামনে এসেছে। ফারাক্কা ব্যারেজকে কেন্দ্র করে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে বাংলাদেশ নতুন করে ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার কূটনৈতিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চলতি বছরের ডিসেম্বরেই ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ, পানির অধিকার এবং বিরোধ নিষ্পত্তির স্পষ্ট কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দিচ্ছে ঢাকা।
কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই চুক্তি নবায়নের পক্ষে। তবে আগের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আরও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত চুক্তি চায় বাংলাদেশ।
সম্ভাবনা রয়েছে, আগামী মে বা জুন মাসে দুই দেশের পানি সম্পদমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে যৌথ নদী কমিশন ও সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে খসড়া প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালে। এই চুক্তির আওতায় জানুয়ারি থেকে মে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে গঙ্গার পানি ভাগাভাগি করা হয়। তবে এতে সরাসরি কোনো গ্যারান্টি ক্লজ না থাকায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে।
এর আগে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল, যা পানির প্রবাহ কমে গেলেও বাংলাদেশকে ন্যূনতম পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা দিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেটিই ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন।
যৌথ নদী কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দুই দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রতিদিন চারবার গঙ্গার পানি পরিমাপ করা হয় এবং চুক্তি অনুযায়ী ভাগ করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উজানে পানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন চুক্তিতে শুধু পানি ভাগাভাগি নয়, বরং পরিবেশগত প্রবাহ (ইকো-সিস্টেম ফ্লো), পলি ব্যবস্থাপনা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার ব্যবস্থাও বিবেচনায় আনা উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, গঙ্গার পানি বণ্টন শুধু কূটনৈতিক ইস্যু নয়—এটি দুই বাংলার মানুষের জীবিকা, কৃষি উৎপাদন এবং পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
তাই নতুন চুক্তিতে উভয় দেশের সাধারণ স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং ন্যায্য সমাধান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য করুন