
অগ্নিঝরা মার্চের আজ দশম দিন। একাত্তর সালের আরও একটি উত্তাল দিন। অগ্নিগর্ভ, বিক্ষুব্ধ বাংলায় বিদ্রোহ-বিক্ষোভের তরঙ্গ প্রবহমান টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। দেশজুড়ে বঙ্গবন্ধুর ডাকা অসহযোগ আন্দোলন চলছে। পাশাপাশি চলছে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি। কোর্ট, কাচারি, অফিস-আদালত বন্ধ।
বাংলাদেশের অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব পড়ে পশ্চিম পাকিস্তানেও। আন্দোলনের তীব্রতা বুঝতে পেরে পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রিকাগুলো তাদের সুর পাল্টে ফেলে। তারা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে পাকিস্তানের সামরিক সরকারকে চাপ দিয়ে নিবন্ধ প্রকাশ করে। ইংরেজী দৈনিক ‘দি পিপলস’ পত্রিকায় সেদিন ভুট্টোর কার্যকলাপের সমালোচনা করা হয়েছিল। সেখানে অতিসত্বর জনপ্রতিনিধিদের কাছে শাসনভার বুঝিয়ে দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
দেশমাতৃকার এই সঙ্কটময় সময়ে লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীরা সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে। কবি, কথাশিল্পী হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে ঢাকায় কবি, সাহিত্যিকরা গঠন করেছিলেন ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’। শিল্পী সংস্কৃতিকর্মীরাও পিছিয়ে ছিলেন না। অগ্নিঝরা মার্চের প্রথম থেকেই বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রসহ সব মাধ্যমের শিল্পীই অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়ে মিটিং, মিছিল, গণসঙ্গীতের অনুষ্ঠান করে আসছিলেন। বিভিন্ন শিল্পী সংস্থা থেকে প্রতিনিধি নিয়ে গঠন করা হয়েছিল ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ’।
এসবের পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানের দামাল ছেলেরা সংঘবদ্ধ হচ্ছিল কঠিন সময় মোকাবেলা করতে। ঘরে ঘরে তখন একই সুর ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো; রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব’- এ স্পন্দন বাঙালীর মনেপ্রাণে উন্মাদতা এনে দেয়। বঙ্গবন্ধুর আহ্বান তাদের নতুন পথের দিশা।
একাত্তরের এই দিনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত উত্তাল। দেশের এমন কোন প্রান্ত নেই যেখানে পাক হানাদারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মিছিল-মিটিং-সমাবেশ হচ্ছিল না। তবে মুক্তিপাগল বাঙালীর দৃষ্টি ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী নির্দেশের। শুধু আন্দোলনই নয়, পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধেরও প্রস্তুতি চলছিল দেশের বিভিন্নস্থানে। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর অফিসার-জওয়ানদের জড়ো করে মুক্তিপাগল দামাল ছেলেরা হাতে-কলমে গ্রহণ করতে থাকে যুদ্ধের কলা-কৌশল।
মন্তব্য করুন