
১৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১। পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। নিয়াজী তখনও গোঁ ধরে বসে আছে। বাকি প্রায় সবারই হৃৎকম্প উঠে গেছে। ঢাকা বিজয়ে প্রচন্ড হামলা রাজধানীর চারদিকে। ১৩ ডিসেম্বর রাত থেকে ১৪ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম দিক থেকে মিত্রবাহিনীর কামান অবিরাম গোলা ছুড়ে চলল। নিয়াজীসহ পাকি হানাদারদের হৃদকম্প তখন তুঙ্গে। পরাজয় নিশ্চিত বুঝে রণেভঙ্গ দিয়ে গভর্নর মালিকের মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে আশ্রয় নেয় রেডক্রসে।
মালিক ও তার গোটা ‘পূর্ব পাকিস্তান সরকারের’ এই সিদ্ধান্তের পর নিয়াজীর অবস্থা আরও কাহিল হলো। জীবন বাঁচাতে আত্মসমর্পণের পথ খুঁজছে পরাজিত পাকিস্তানি হায়েনার দল। পাকি জেনারেল নিয়াজী বার বার নিরাপদ আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে ভারতের সেনাপ্রধান মানেকশর সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিল। আত্মসমর্পণের পর হামলা নয়, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইছিল জেনারেল নিয়াজীসহ পাক জেনারেলরা।
মিত্রবাহিনীর কামানের গোলা গিয়ে পড়ল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টেও। সে গোলার আওয়াজে গোটা শহর কাঁপলো। ঢাকার সবাই বুঝল, আর রক্ষা নেই। গভর্নর মালিক সেদিন সকালেই ‘সমগ্র পরিস্থিতি’ বিবেচনার জন্য গভর্নর হাউসে মন্ত্রিসভার এক জরুরী বৈঠক ডাকলেন। ওই বৈঠক বসানোর ব্যাপারেও রাও ফরমান আলী এবং চীফ সেক্রেটারি মুজাফফর হোসেনের হাত ছিল। মন্ত্রিসভার বৈঠক বসল বেলা ১১টা নাগাদ। একটি পাকিস্তানী ওয়্যারলেস ম্যানেজ করে মিত্রবাহিনীও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জেনে গেলো এই বৈঠকের খবরটা।
সঙ্গে সঙ্গেই সংবাদ চলে গেল ভারতীয় বিমানবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় হেড কোয়ার্টারে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই একঝাঁক ভারতীয় জঙ্গী বিমান গভর্নর হাউসের ওপর একেবারে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে রকেট ছুড়ল। গোটাপাঁচেক গিয়ে পড়ল গভর্নর হাউসের ছাদের ওপর। মালিক ও তার মন্ত্রীরা ভয়ে প্রায় কেঁদে উঠল। চীফ সেক্রেটারি, আইজি পুলিশসহ বড় বড় অফিসারও মিটিংয়ে উপস্থিত ছিল। তারাও ভয়ে যে যেমনি পারল পালাল।
বিমান হানা শেষ হওয়ার পর মালিক সাহেব তার পাকিস্তানী মিত্রদের সঙ্গে আবার বসল। তারপর আর পাঁচ মিনিটও লাগল না তাদের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে। তারা সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিল। পদত্যাগের সিদ্ধান্ত তারা সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রতিনিধি রেনডকে জানাল এবং তার কাছে আশ্রয় চাইল। রেনড তখন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলকে (বর্তমানে রূপসী বাংলা হোটেল) রেড ক্রসের অধীনে ‘নিরাপদ এলাকা’ করে নিয়েছেন। বহু বিদেশী এবং পশ্চিমা পাকিস্তানী আশ্রয় নিয়েছিল ওই হোটেলে।
মন্তব্য করুন