
২৬ মার্চ শুরু হওয়া স্বাধীনতা যুদ্ধে ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত সময়ে শহীদ হয়েছেন লাখ লাখ বীর বাঙালি। তাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে এদেশের মাটি। রক্তরঞ্জিত দিন-মাস পেরিয়ে আজ ১০ ডিসেম্বর। এদিন বাংলাদেশের বেশিরভাগ স্থানেই হানাদারবাহিনী পরাজিত হতে থাকে। আর বাংলার ঘরে ঘরে উড়তে থাকে বিজয় নিশান। দিকে দিকে শোনা যায় ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান।
১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ছিল শুক্রবার। ঢাকায় কারফিউ চলছে। বিদ্যুৎ নেই। পুরো ঢাকা অন্ধকারে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল (রূপসী বাংলা হোটেল) ও হলি ফ্যামিলি হাসপাতালকে নিরাপদ জোন ঘোষণা করা হয়। বিদেশী কূটনীতিক ও নাগরিকেরা এখানে আশ্রয় নেন। এদিন ভারতীয় মিত্রবাহিনী ঢাকার রেডিও অফিস বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। বন্ধ হয়ে যায় সম্প্রচার। বোমাবর্ষণ চলে চট্টগ্রামে ও চালনা বন্দরে। সকাল থেকে তিন ঘণ্টা যুদ্ধ চলে চালনায়। কমপক্ষে দশটি জাহাজ ধ্বংস হয়।
একাত্তরের আজকের দিনে লাকসাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া ও খুলনায় প্রচণ্ড লড়াই হয়। রংপুর ও দিনাজপুরের পাকিস্তান সেনারা বগুড়া ও রাজশাহী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রাতে বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। লাকসাম মুক্ত হয়। সেখানে প্রায় ৫০০ পাকিস্তানি সেনাসহ কমান্ডিং অফিসার আত্মসমপর্ণ করে। বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি ক্যাম্প গুটিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু ক্যাম্পের সৈন্যরা তখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে যুদ্ধরত ছিল। হঠাৎ করে ক্যাম্প গুটিয়ে নেয়ার খবর তাদেরও জানানো হয়নি ক্যাম্প থেকে। ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এসব পাকিস্তানি সৈন্য বিভিন্ন এলাকায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে, পাকিস্তানিদের পরাজিত করে সর্বত্রই বীর মুক্তিযোদ্ধারা উড়াচ্ছে রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী আর তাদের দোসর আলবদর-রাজাকাররা শেষ আঘাত হানছে। হত্যা ও ধ্বংসের বিভীষিকার তান্ডব চালাচ্ছে ওরা। কিন্তু সব পায়ে দলে এক নদী রক্ত পেরিয়ে বিজয় পতাকা উড়ছে বাংলাদেশের আকাশে।
একাত্তরের এদিন ৫৭ নম্বর ডিভিশন গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিল মিত্রবাহিনী কিভাবে রাজধানী ঢাকার নদীর বাধা অতিক্রম করে। ভোর থেকে ভৈরববাজারের ৩/৪ মাইল দক্ষিণে হেলিকপ্টার করে নামানো হলো ৫৭ নং ডিভিশনের সৈন্য। সারাদিন ধরে মেঘনা অতিক্রমের সেই অভিযান চলে। প্রথম বাহিনীটা ওপারে নেমেই ঘাঁটি গেড়ে বসল। কিছুটা উত্তরে ভৈরববাজারের কাছেই তখন পাকিস্তানি সৈন্যদের বড় একটা মজুদ। ব্রিজটার একটা অংশ ভেঙ্গে দিয়ে নদীর পশ্চিম পাড়ে ওৎ পেতে বসে থাকে হানাদাররা। আকাশে সূর্য উঠতেই তারা দেখতে পেল হেলিকপ্টার। নদী পার হচ্ছে, তা দেখেও হানাদাররা ঘাঁটি ছাড়তে সাহস পেল না। ভাবল ওটা বোধহয় মিত্রবাহিনীর একটি ধাপ্পা। ওদিকে ছুটে গেলেই আশুগঞ্জ থেকে মূল মিত্রবাহিনী ভৈরববাজার-ঢাকার রাস্তা ধরবে।
মন্তব্য করুন