
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত কয়েকদিন ধরে একটাই দাবি ভাইরাল—২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর নাকি বাংলাদেশে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানবে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে রাজধানী ঢাকা এবং মৃত্যু হবে লাখ লাখ মানুষের। ফেসবুক নিউজফিডে ভেসে বেড়ানো এসব পোস্ট সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
গুজবের উৎস অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, জ্যোতিষশাস্ত্রের তথাকথিত হিসাব, গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান এবং “বৃহস্পতির বক্রী গতির প্রভাব”-এর ওপর ভর করেই এই গল্পটি ছড়িয়েছে। দাবি করা হচ্ছে—৪ ডিসেম্বর পূর্ণিমা, তাই ৬ ডিসেম্বর ভূকম্পন আসবেই! কিন্তু আধুনিক ভূবিজ্ঞান বলে—এ ধরনের পূর্বাভাস সম্পূর্ণ অসম্ভব।
ভূমিকম্প পূর্বাভাস নিয়ে মানুষের কৌতূহল শত বছরের পুরনো। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) নিশ্চিত করেছে—পৃথিবীর কোথাও, কোনো বিজ্ঞানী এখন পর্যন্ত দিন-তারিখ ধরে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে পারেননি।
ভূমিকম্প পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য প্রয়োজন তিনটি সুনির্দিষ্ট তথ্য— কোথায় হবে, কখন হবে, মাত্রা কত হবে।
আজকের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সত্ত্বেও কোনো দেশ বা গবেষণা সংস্থা এই তিনটি তথ্য আগে থেকে নির্ভুলভাবে জানাতে পারে না। সুতরাং ৬ ডিসেম্বর ভূমিকম্পের গুজব—সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন মিথ্যা খবর।
গুজব ভিত্তিহীন হলেও দেশের ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা আলাদা। বাংলাদেশ অবস্থান করছে তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে— ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট, বার্মিজ প্লেট, এ কারণে ভূগর্ভে ক্রমাগত শক্তি জমা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান—সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিশাল অঞ্চলে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির মতো শক্তি ভূগর্ভে জমা রয়েছে। শিলাচ্যুতি যখন হঠাৎ শক্তি ছেড়ে দেয়, তখনই ভূমিকম্প হয়—এটি কোনো নির্দিষ্ট দিন-তারিখ মেনে আসে না।
বাংলাদেশের আশপাশের অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের একটি পুনরাবৃত্তিমূলক চক্র রয়েছে। ১৭৬২: গ্রেট আরাকান ভূমিকম্প (৮.৫ মাত্রা), ১৮৯৭: গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্প (৮.৭ মাত্রা), ১৯৩০: ধুবড়ি ভূমিকম্প (৭.১ মাত্রা)। ১৯৩০ সালের পর প্রায় ১০০ বছর ধরে বড় ভূমিকম্প হয়নি, ফলে ভূগর্ভে শক্তি সঞ্চিত হওয়া স্বাভাবিক।
বুয়েটের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ঢাকা শহরের অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল ভবন কাঠামো এবং ঘনবসতিই প্রধান ঝুঁকি।
রাজউকের এক সমীক্ষা বলছে, যদি ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকায় আঘাত হানে, ৮.৫ লাখ ভবন ধসে পড়তে পারে, মৃত্যুর সংখ্যা হতে পারে প্রায় ২ লাখ। তবে এটি কোনো নির্দিষ্ট তারিখের পূর্বাভাস নয় বরং অবকাঠামোগত দুর্বলতার দীর্ঘমেয়াদি চিত্র।
২১ নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর দেশে যে ছোট ছোট কম্পন হচ্ছে, তা নিয়ে অনেকেই ভীত। কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম জানান, এগুলো শুধু আফটারশক, যা বড় ভূমিকম্পের পরে স্বাভাবিকভাবেই হয়ে থাকে। এর অর্থ এই নয় যে বড় ভূমিকম্প আসন্ন।
অনেকে মনে করেন, ভূমিকম্পের আগে প্রাণীরা অস্বাভাবিক আচরণ করে। তবে বিজ্ঞানীরা এটিকে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস পদ্ধতি হিসেবে মানেন না।
এমনকি প্রযুক্তিতে শীর্ষস্থানীয় দেশ জাপান, যুক্তরাষ্ট্রও এখনো ভূমিকম্পের দিনক্ষণ আগে থেকে জানানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারেনি। তারা সর্বোচ্চ কয়েক সেকেন্ড আগে সতর্কবার্তা দিতে সক্ষম—যা ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সহায়ক, কিন্তু গুজবের মতো দিন আগে জানানো সম্ভব নয়।
৬ ডিসেম্বরের ভূমিকম্প গুজব পুরোপুরি ভিত্তিহীন হলেও আমাদের মূল সমস্যা হলো প্রস্তুতির অভাব।
ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা যায় না, কিন্তু সঠিক নির্মাণ বিধিমালা, পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার, সচেতনতা, মহড়া —এর মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
যা করা জরুরি— নিজের বাসা ও অফিসের ভবন ভূমিকম্প সহনীয় কিনা পরীক্ষা করুন, রাজউকের গাইডলাইন মেনে নির্মাণ করুন, গুজবে কান না দিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানে আস্থা রাখুন।
৬ ডিসেম্বরকে ঘিরে ছড়ানো আতঙ্ক সম্পূর্ণই গুজব ও ভুল তথ্যের ফসল। ভূমিকম্প এমন দুর্যোগ, যা কোনো দেশই সুনির্দিষ্টভাবে পূর্বাভাস দিতে পারে না। আমাদের করণীয় হলো— গুজব নয়, বৈজ্ঞানিক তথ্য ও প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দেওয়া।
মন্তব্য করুন