
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ পাঁচ বছর কেটেছে হাসপাতালের শয্যায়। নানা অসুস্থতা ও চিকিৎসার কারণে এই সময়ে তাকে মোট ৪৮৪ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। কখনো কারাবন্দি অবস্থায়, কখনো মুক্ত থেকেও গুরুতর অসুস্থতায় এই সময় তিনি দেশের মাটিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন খালেদা জিয়া। এর আগে টানা ৪০ দিন তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
খালেদা জিয়া দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত দেশের মাটিতেই চিকিৎসা নেওয়ার পক্ষেই ছিলেন। ছেলে তারেক রহমানের প্রচেষ্টা, পুত্রবধূদের অনুরোধ বা চিকিৎসকদের আগ্রহ তাকে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি। মেডিকেল বোর্ডের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে তিনি দেশেই চিকিৎসা নিতে চেয়েছিলেন। তবে চলতি বছরের শুরুতে শারীরিক অবস্থার কিছুটা স্থিতিশীল থাকায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা নিয়েছিলেন।
মেডিকেল বোর্ডের এক সদস্য জানান, মঙ্গলবার ভোরের দিকে খালেদা জিয়ার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে যায়। ভোর সাড়ে ৫টার পর হার্ট বিট দ্রুত কমতে থাকে। এই সময় মায়ের শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করেন তারেক রহমান। ভোর ৬টায় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত্যুর সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, প্রয়াত ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। আবেগঘন পরিবেশে শামিলা রহমান ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন এবং অনেক চিকিৎসকও দুঃখ প্রকাশ করেন।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, দেশেই চিকিৎসা নিতে চেয়েছিলেন দেশনেত্রী। বিদেশে যাওয়ার কথা একবারও বলেননি। মেডিকেল বোর্ডের ওপর তার পূর্ণ আস্থা ছিল। তিনি চিকিৎসক ও সহকর্মীদের খোঁজখবর নিতেন এবং জ্ঞান থাকা পর্যন্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতেন।
দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদরোগ ও চোখের সমস্যা সহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। গত পাঁচ বছরে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। সর্বশেষ ২৩ নভেম্বর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২৭ নভেম্বর সিসিইউতে নেওয়া হয় এবং পরে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত মূল ঘটনাসমূহ:
৬ অক্টোবর ২০১৮: কারাগার থেকে অসুস্থ অবস্থায় বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। ২৫ মার্চ ২০২০: সরকারি নির্বাহী আদেশে বাসায় ফিরেন। ১১ এপ্রিল ২০২১: কোভিড-১৯ পজিটিভ রিপোর্ট। ২৭ এপ্রিল ২০২১: কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি। ১৯ জুলাই ২০২১: কোভিড-১৯ টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণ। ১১ জুন ২০২২: হঠাৎ অসুস্থ হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি। ২৪ জুন ২০২২: হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন। ৬ আগস্ট ২০২৪: রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান। ৭ জানুয়ারি ২০২৫: উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান। ৫ মে ২০২৫: চিকিৎসা শেষে ঢাকায় ফেরেন। ১৯ জুন ২০২৫: এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি। ২৪ জুলাই ২০২৫: আবার হাসপাতালে ভর্তি। ২৮ আগস্ট ২০২৫: স্বাস্থ্যপরীক্ষা। ১৫ অক্টোবর ২০২৫: রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি। ২৩ নভেম্বর ২০২৫: সর্বশেষ হাসপাতালে ভর্তি। ২৭ নভেম্বর ২০২৫: সিসিইউতে নেওয়া হয়। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫: মৃত্যুবরণ।
মন্তব্য করুন