
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসিকে উদ্দেশ করে অনেক ভক্তকে ‘বাবা’ শব্দটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। কেউ মজা করে, কেউ প্রতিপক্ষকে খোঁচা দিতে, আবার কেউ অতিরিক্ত আবেগ ও ভক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মেসিকে এভাবে সম্বোধন করেন। তবে একজন মুসলিমের জন্য এ ধরনের শব্দচয়ন কতটা গ্রহণযোগ্য—তা নিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা রয়েছে।
ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইসলামে মানুষের প্রকৃত বংশপরিচয় ও পিতৃপরিচয় সংরক্ষণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সুরা আল-আহজাবের ৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদেরকে তাদের পিতার নামেই ডাকো। এটিই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সঙ্গত।’ এ আয়াতের আলোকে ইসলামী শরিয়তে প্রকৃত পিতার পরিচয় গোপন করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কাউকে পিতা হিসেবে দাবি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
এ বিষয়ে হাদিসেও কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে জেনে-শুনে নিজের প্রকৃত পিতা ছাড়া অন্য কাউকে পিতা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইসলামী আলেমদের মতে, এসব নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের বংশপরিচয় বিকৃত করা থেকে বিরত রাখা। তাছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জেনে-শুনে নিজ পিতা ছাড়া অন্য কাউকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৭৬৬)
আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে তার পিতা ব্যতীত অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানুষের লানত।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৭০) এ হাদিসগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো বংশপরিচয় বিকৃত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
মজা করে বা আবেগে কাউকে 'বাবা' বলা যাবে কি? যদি কেউ সত্যিকার অর্থে তাকে নিজের জন্মদাতা পিতা মনে না করে, তবে এটি বংশ পরিবর্তনের শামিল নয়। তবে এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। ইসলাম ভাষার শালীনতা ও শব্দচয়নের প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। একজন মুসলিমের মুখ থেকে এমন শব্দ বের হওয়া উচিত নয়, যা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, অতিরঞ্জিত ভক্তি প্রকাশ করে অথবা পিতা শব্দের মর্যাদাকে হালকা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার নিকট তৎপর প্রহরী (ফেরেশতা) উপস্থিত থাকে।’ (সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ১৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা এমন একটি কথা বলে, যার পরিণতি সে গুরুত্ব দেয় না; অথচ সে কারণে সে জাহান্নামে অনেক দূরে নিক্ষিপ্ত হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৮) অতএব, ‘বাবা’ শব্দটি ঠাট্টা, ট্রল বা অন্ধ ভক্তির ভাষা হিসেবে ব্যবহার করাও একজন মুসলিমের মর্যাদাপূর্ণ চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ফুটবল বা অন্য কোনো খেলাকে ঘিরে আবেগ ও ভালোবাসা থাকা স্বাভাবিক। তবে একজন মুসলিমের জন্য সেই আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রেও ধর্মীয় মূল্যবোধ ও শালীনতার সীমারেখা মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। প্রিয় খেলোয়াড়ের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য এমন শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে, যা বিভ্রান্তি তৈরি করে না এবং ইসলামী আদবের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সুতরাং, মেসি বা অন্য কোনো খেলোয়াড়কে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করার ক্ষেত্রে মুসলিমদের শব্দের উদ্দেশ্য, প্রচলিত অর্থ এবং এর মাধ্যমে কী ধরনের বার্তা যাচ্ছে—তা বিবেচনা করা উচিত। বংশপরিচয় পরিবর্তনের উদ্দেশ্য না থাকলেও, সতর্কতা ও তাকওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের শব্দচয়ন এড়িয়ে চলাই উত্তম বলে মনে করেন অনেকে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের কথাবার্তা, আচরণ এবং ভালোবাসার প্রকাশ—সব ক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন
১৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম
১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:০১ পিএম